সম্বিত বসু


আমার বন্ধু সৈকত দে


এসেছে চট্টগ্রাম থেকে। বেশ কয়েকদিনের জন্যই। এদিন-ওদিন এদিক-ওদিক করে কম দেখা হল,এমনটা বলা যাবে না। একদিন কলেজ স্ট্রিট, নন্দন একদিন। একদিন ঘুরে ঘুরে হরিশ চ্যাটার্জী স্টিটের মারাত্মক ভালো কচুরি আর চা। স্তুতির কল্যাণে। অনেক ছবি তোলা হল। গাছের ছবি। ছায়ার ছবি। মাথার অনেক ওপরে জট লেগে যাওয়া চুলের মত তারের ছবি। জড়িয়ে ধরার ছবি। চা-খাওয়ারও। কথা হল থিও-প্রেম-স্মৃতি নিয়ে। আর হাঁটাও হল প্রচুর। কত মানুষ দেখা হল। মানুষের হাঁটা কত পাল্টে গেছে। প্যান্ট গুটিয়ে লোকে আর তেমন হাঁটে না। বাসে যেতে যেতে পুরনো বাড়ির দোতলাও দেখতে ইচ্ছে করে। কী কী রাখা থাকে কালো বারান্দাগুলোয়? নিচে অনেকদিন আগে হয়তো ছবি তোলার দোকান ছিল। এখনও সেই বারান্দার পাশের দেওয়ালে আধচটে গিয়েও রয়ে গেছে সেই সাইনবোর্ড। সুরমা স্টুডিও, এখানে ছবি তোলা হয়। খুব পুরনো পুরনো নাম হলেও জানতে ইচ্ছে করে কে সুরমা। কিরকম দেখতে ছিল তাকে? বাসে উঠত? সাইকেল চালাতে পারত? হারমোনিয়াম?
ছবিঃ অর্পণ ঘোষ 
বারান্দায় দেখি মাদুর দেওয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে। পুরনো মাদুর। ছাদে নিয়ে গিয়ে আর তোলা হয়নি। একদিকটা একটু ছিঁড়েই গেছিল। হঠাৎ বৃষ্টি আসে রাতে। সকালে উঠে দেখে নোংরা ভেজা ভেজা কালো হয়ে গেছে সেটা। এখন কি করবে সে! বারান্দায় যে করে হোক দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া? সারাজীবন ধরে যেন একটাই বিশ্রামহীন টেস্ট ম্যাচ খেলা হচ্ছে। আর সে আম্পায়ার। তার আঙুল নেই। জোর করে ম্যাচ বন্ধ করে দেওয়ার ক্ষমতাও নেই। তাকে শুধু দেখে যেতে হবে। বিসর্জন দেওয়ার পর কাঠামোর মতো চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকা তার আর কিছু করার নেই এখন। কিংবা আছে। কবির দৃষ্টি। সারাদিন ধরে যা যা হচ্ছে দেখে যাচ্ছে সে। অফুরন্ত মানুষের চলাচল। ফুলের গাড়ি, শববাহী গাড়ি, মিছিলের গাড়ি। এই দেখাই তার ভেতর ঢুকিয়ে দিচ্ছে জীবনীশক্তি। এই দেখতে পাওয়াই তাকে একেবারে বাতিলের দল থেকে আলাদা রেখেছে।
বেতের গোল চেয়ার। সেগুলোই দিনের পর দিন বসে থাকে বারান্দায়। ভোটের আগে ওগুলোকেই বাড়ির সদস্য সংখ্যা জিজ্ঞেস করে কাজ চালিয়ে নেওয়া যায়। মানুষও এমনভাবেই বসে থাকে বারান্দায়? একটা বেতের গোল চেয়ার সে তো নিজেকে একটু ছড়িয়ে দিলেই হতে পারে। স্কুলের স্যারেরা সেই কবে শাস্তি দিয়েছিলেন চেয়ার হওয়ার। সেই কি শুরু ছিল বারান্দায় বসে থাকবার?
কাল পনেরো। পনেরো তারিখ ছিল তোমার ফেরত যাওয়ার দিন। আমার কাছে দেশভাগের কোনো স্মৃতি নেই। বই পড়ে যেটুকু বোঝার বুঝেছি। আর কিছুটা ঋত্বিক ঘটকের ছবি দেখে। কিছুটা মান্টোর গল্পে চুপ থেকে। এখন ভাবছি যদি সত্যিই ফিরতে এই পনেরো তারিখে তাহলে কি দেশভাগের কোনো স্মৃতি আমার ভেতর চলে আসত না? আমি কি আর একটু ছুঁয়ে দেখতে পারতাম ফিল্মের সত্যিটাকে? মান্টোর অস্হিরতাকে?
তখন আমি কি করতাম সৈকত? বারান্দায় চেয়ার হয়ে বসে থাকা ছাড়া? মাদুর পেতে শুয়ে থাকা ছাড়া? আমার ভেতরে যে দেশভাগ, যে শাস্তি, তখন কি সেসবেরও ছবি তুলত সুরমা স্টুডিও?


                                                            ১৪ ই আগস্ট, ২০১৬ 

0 comments:

Post a Comment

ধারাবাহিক উপন্যাস

ধারাবাহিক অনুবাদ

পুরাতনী

Powered by Blogger.

যোগাযোগ করুন

Name

Email *

Message *

Total Pageviews

Sample Text

আপনাদের ছোটো বা বড় গল্প পাঠান । বিশেষ করে সেই লেখাটি যা কেউ পড়বেনা ভেবে পাঠাননি আগে কোথাও। লেখা পাঠাবার ঠিকানা-mackerelblogzine@gmail.com

*[ লেখা বেছে নেবার ক্ষেত্রে সম্পাদকের রায় চুড়ান্ত বলে বিবেচিত হবে । ]

Copyright © ম্যাকারেল | Powered by Blogger
Design by SimpleWpThemes | Blogger Theme by NewBloggerThemes.com | Distributed By Blogger Templates20