বাঁশি
: হস্তান্তর নয় আত্মান্তর
সুইসাইডের
কথা অশ্বথামার জানা ছিল না, ব্লেড ছিল না ফ্যান ছিল না... অশ্বত্থামা তাই হেঁটে বেড়াচ্ছে, ক্লান্তির
ক্ষমা না হবার অপেক্ষায় ক্রমে ক্রমে রাস্তার ধুলো হবার প্রার্থনায় অশ্বথামা সমস্ত
পথ অতিক্রম করছে, কোথায় গিয়ে পথের শেষে দরজা বাঁধানো, কেউ জানেনা।
ঠিক
যেমন ভাবে বাঁশিতে সুর এসে যখন বাঁধা পড়ল, বাঁশির আশপাশের হাওয়া তখন বিভোর মাতাল
সম্মোহিতের ঈশ্বর... সেও জানল না কখন তাকে থামতে হবে। বাঁশি থেকে সুর ভেসে আসছে আর
তোলপাড় করে দিয়ে যাচ্ছে পাশের বাড়ি, একটু দূরে গাছের তলায় ছায়া, আরেকটু দূরে
মফস্বলের গলি - গলি পেরিয়ে বড় রাস্তা - রাস্তা পেরোতে পেরোতে মাঠ, মাঠ পেরিয়ে
ট্রেন লাইন, ট্রেনের জানলার ধারে বসে থাকা মানুষটার বুকপকেট এফোঁড়ওফোঁড় করে দিয়ে
সুর ঢুকে পড়ল মনে.... আর তারও পরে, তারও দূরে বসে থাকা আরেক মানুষ, তার মনে পড়ে
যাচ্ছে কোনও সুর। বাঁশির। গাছের গাছ কে মনে পড়ছে। রাস্তার মনকেমনে বিদেশি রাস্তা
এসে ওভারল্যাপ করছে। রেড সিগন্যাল। জেব্রা ক্রসিংয়ের ধার ঘেঁষে এই ফুট থেকে ওই
ফুটে চলে যাচ্ছে বাঁশিওয়ালা আর নিয়ম-অনিয়মের মাঝখানে থমকে আছে ট্র্যাফিক।
থমকে
আছে শহর থেকে গ্রাম। অবাধ্য ইঁট-পাথরে গেঁথে তাদের গড়া তো গেল। কিন্তু মানুষ বাঁধা
পড়েনা পুরোপুরি। পাখিও আকাশ থেকে তাকায়। পাখির মতো, মানুষ তাকায় পায়ের দিকে, পায়ের
তলায় মাটির দলা, ঘাটের চিহ্ন, নদীর ছিটে, বৃষ্টির দাগ। ওপরের দিকে তাকাতে তাকাতে
মন ততক্ষণে পাখি হয়ে যায়...
![]() |
ছবিঃ অর্পণ ঘোষ
|
এ
যেন সবই বাঁশিকে অনুকরণ। e সিরিজের অঙ্কের মতো, এর কোনও থামা নেই। কানে ভাসতে
ভাসতে ভবিষ্যতকে বর্তমানে টেনে আনে, বর্তমানকে অবশ করিয়ে অতীতে নিয়ে যায়... তারপর
মনে পড়ায়... অকারণে অহেতুক মনে পড়ায়। দূরের আকাশ কাছে হয়, কাছের মাটি পা থেকে সরে
যায় অন্য কারও পাখি হবার দিকে।
ট্রেনে
ওঠবার আগে সে যখন শেষবারের মতো জড়িয়ে ধরল, যেন সেই মুহুর্তের শেষ শক্তিটুকু দিয়ে
গেল আমাকে। তার পিঠের ব্যাগে তখন আমার দু'বছরের সঙ্গী বাঁশি উঁকি মারছে। খাওয়ার
শেষে হোস্টেলের ছাদে এসে রাগ বেহাগের কয়েকশো দিনের যন্ত্রণা, কলেজ থেকে ফিরে
জানলার ধারে বসে কয়েক সপ্তাহের রাগ পুরিয়া কল্যাণের গোধূলি রঙ তখনও তাতে লেগে আছে।
লেগে আছে খামাজের কিছু ক্ষত। 'সাওন বিতো যায়ে পীহরওয়া...' বিলম্বিতে ফিরে ফিরে
আসছে গতের পিছুটানে...
দুই
প্রিয়জনের মাঝে যখন দূরত্ব আসে, সেই ব্যবধানে বাঁশি বাজে আর দূরত্ব লঘু হতে থাকে।
কিন্তু যে ঠোঁটে আলাপ-গল্পঠাট্টা-একথাওকথা-চুম্বনের থেকেও গাঢ় হয় বাঁশি, তার কী
হবে, যখন বাঁশিই থাকল না যদি আর কাছে...
অন্যের
বাঁশি তাকে দোলায় না, অন্যের সুর তাকে কুরেকুরে খাওয়ার আগেই পৃথিবী অন্যমনস্ক হয়ে
যায়। সেই প্রিয়জনকে কাছে ডাকে, সুরে অনাথ হাওয়া তার কাছে অবধি যায় গাছের পাতা -
এরোপ্লেনের ডানা - মেঘের হইচই পেরিয়ে... কিন্তু ওই কাছে অবধি যায়। আর খবর আনে...
কী
খবর?
সেই
প্রিয় বাঁশি শিখছে। মীড় শিখছে কোমল নিষাদ কে শুদ্ধ নিষাদ এর কোলে টেনে ক্রমশ সা তে
গিয়ে পৌঁছনোর খেয়ালে...
হাওয়া
ফিরে আসছে। তাতে কাটা কাটা স্বর। মনে মনে আমি তাতে স্মৃতির সেলাই বুনে দিচ্ছি। সুর
হয়ে বাজছে। অস্পষ্ট খবর আসছে।
অপেক্ষার
বিকল্প হয় না এক্ষেত্রে... স্পষ্ট খবর আসছে, আঙুল সরতে শিখছে, মীড় তৈরি হচ্ছে
সুরের ভেতর...
আমি
কান পেতে রই। দূরের মানুষ কাছে আসার পালা। কাছের সমস্ত আজ আস্তে আস্তে দূরে যায়,
আরেক বাঁশি তৈরি হয়ে আমার হাতে আসে... আরেক বাঁশিকে নিয়ে গাঢ় হবার দিন ঘনিয়ে আসে,
রাত্রিরা জোনাকি হয়।
অপেক্ষা
চলতে থাকে... একদিন এই বাঁশিও আমায় ছেড়ে অন্য কারোর হাতে উঠে যাবে... হাত তো নয়,
যে হস্তান্তর বলবে... আত্মান্তর।
আসলে
কিছুই কি নিজের হাতে ছিল, যে অন্য কাউকে তা দিয়ে দেবার স্মৃতি কাতর করবে... এসবই
যেন চক্র, এসমস্ত বস্তু ও ভাবনা আসলে আত্মা। এক শরীর ছেড়ে আরেক শরীর বেছে নেয়।
কোনও
অদৃশ্য অলৌকিকতা আমাদের সাথে প্রতিমুহুর্তে খেলা করে চলেছে দেওয়া-নেওয়ার
অন্তরালে...

:) bah
ReplyDelete