চেরনোবিলের কণ্ঠস্বর: একটি পারমাণবিক দূর্ঘটনার কথ্য ইতিহাস
স্ভেৎলানা আলেস্কেইভিচ
মৃতের ভূমি
জীবিত এবং মৃতের বিষয়ে কি কি বলা যায় সে সংক্রান্ত একাকী সংলাপ
রাতে উঠোনে নেকড়ে এসেছিল। আমি জানালা থেকে তাকাই এবং দেখি নেকড়েটা
দাঁড়ানো, তার চোখ দু’টো গাড়ির হেডলাইটের মত জ্বলে। এখন ত’ আমি সবকিছুতেই অভ্যস্ত হয়ে
গেছি। গত সাতটা বছর ধরে আমি একা বেঁচে আছি। যেদিন থেকে সবাই আমাকে ছেড়ে চলে গেছে, সেদিন
থেকে আমি একাকী জীবন কাটাচ্ছি। কখনো কখনো গোটা রাতটা আমি একা একা বসে শুধু ভাবি আর
ভাবতেই থাকি যতক্ষণ না সকালের আলো ফুটে ওঠে। তখন দরজা খুলি সকালের আলো দেখতে। তোমাকে
আমার কি বলা উচিত বলো ত’? পৃথিবীতে মৃত্যু অন্য সব কিছুর থেকে খানিকটা আলাদা: কেউ এটা
এড়াতে পারে না। মৃত্তিকা তার নিজস্ব গ্রাসে সবকিছু নিয়ে নেয় একটি সময়- দয়াবান, নিষ্ঠুর,
পাপী সবাইকে। এসবকিছু ছাড়া আরো বলা যায় যে পৃথিবীতে কোন ন্যায় বিচার নেই। আমি সারা
জীবন সততার সাথে কঠোর পরিশ্রম করেছি। তবু আমি ন্যায় বিচার পাইনি। ঈশ্বর যেন তার ইচ্ছানুসারে
নানা কিছু ভাগ করে ফেলছিলেন এবং সময়প্রবাহে আমার পালা যখন এলো, আমার জন্য কিছুই আর
অবশিষ্ট ছিল না ।একজন তরুণও মারা যেতে পারে, একজন বৃদ্ধ ব্যক্তিকে মারা যেতে হয়...শুরুতে,
আমি অপেক্ষা করতাম যে যারা চলে গেছে ওরা আবার ফিরে আসবে- আমি ভাবতাম ওরা আবার ফিরে
আসবে। কেউ বলেনি ওরা চিরতরে চলে যাচ্ছে, যারা চলে গেছে ওরা আমাকে বলেছিল যে খানিকটা
সময়ের জন্য বাইরে যাচ্ছে মাত্র। কিন্ত আজ আমি শুধুই মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছি। মৃত্যু
কঠিন নয়, তবে ভীতিকর। সেখানে কোন গির্জা নেই। পুরোহিত আসেন না। কারো কাছে আমি আমার
পাপ স্বীকার করতে পারি না।
![]() |
ছবিঃ ইন্টারনেট আর্কাইভ
|
মানুষজন সব ভয় পেয়ে গেল। ভয়ে ভীত প্রত্যেকে। রাত্তির বেলাতেই
মানুষজন তাদের জিনিষ-পত্র সব গোছাতে শুরু করলো। আমি নিজেও আমার কাপড়-চোপর সব ভাঁজ করা
শুরু করলাম। আমার সৎ খাটুনির স্বীকৃতি হিসেবে লাল ব্যাজ আর যে ভাগ্যবান কোপেইকা আমার
ছিল। কি বিষাদ! এক গভীর বিষাদ আমার হৃদয় আচ্ছন্ন করে ছিল। মিথ্যে কথা বললে এখানেই যেন
আমি মারা যাই। আর তারপরই আমি শুনতে পেলাম যে কিভাবে সৈন্যরা গ্রামগুলো সব খালি করে
দিচ্ছিল আর শুধু বুড়ো-বুড়িরা নড়তে না পেরে থেকে গ্যাছে সেই সব গ্রামে। যতক্ষণ পর্যন্ত
না সৈন্যরা সাধারণ গ্রামবাসীকে বাসে তুলে দিয়েছে (গ্রাম খালি করার জন্য), ততক্ষণ পর্যন্ত
তারা তাদের গরুগুলো বনে নিয়ে গেছে। সেখানেই তারা অপেক্ষা করতে চাচ্ছিল। সেই দ্বিতীয়
মহাযুদ্ধের সময় যেমন বেলারুশের মানুষ জার্মানরা গ্রাম পুড়িয়ে দেবার পর তাদের অরণ্য
ভূমে আশ্রয় নিয়েছিল। আমাদের সৈন্যরা কেন আমাদের তাড়া করবে? (কান্না শুরু করে)। আমাদের
জীবনে একদমই কোন স্থিতি নেই। আমি কাঁদতে চাই না।
ওহ! ওদিকে তাকাও- একটি কাক। আমি ওদের তাড়াই না। যদিও কখনো কখনো
কাক যদিও গোলাঘর থেকে কাক পাখি প্রায়ই ডিম চুরি করে। তবু আমি তাদের তাড়িয়ে দিই না।
আমি কাউকে তাড়াই না। গতকাল একটি ছোট খরগোশ এসেছিল। পাশেই একটি ছোট্ট গ্রাম আছে, সেখানে
একজন মাত্র নারী এখন বাস করে। আমি তাকে বলেছিলাম আমাদের এখানে চলে আসতে। আমি হয়তো সাহায্য
করতে পারব বা পারব না, তবে অন্তত: কথা বলার ত’ কাউকে পাব। রাতে শরীরের যন্ত্রণা বাড়ে।
রাতে পা এমন লাগে যেন সার সার পিঁপড়ের ভেতর দিয়ে আমি চলছি। যেন বা আমার ¯œায়ুগুলো ছিঁড়ে যেতে চাইছে। নিচু হয়ে
কিছু তোলার সময় যেমন লাগে। যেন বা গম পেষাই হচ্ছে। হামানদিস্তায় ঘ্যাঁচোর ঘ্যাঁচোর
পেষাই। তারপর একটা সময় ¯œায়ুগুলো
শান্ত হয়। আমার জীবনে এ পর্যন্ত অনেক পরিশ্রম করেছি আমি। সবকিছুই অনেক পেয়েছি এবং আর
কিছু চাই না।
আমার মেয়েরা আছে, ছেলেরা আছে...ওরা সবাই শহরে থাকে। কিন্ত আমি
কোথাও যাচ্ছি না। ঈশ্বর আমাকে আয়ু দিয়েছেন কিন্ত বেঁচে থাকার ভাল আয়ুধ দেন নি। আমি
জানি দেখতে দেখতে বুড়োরা কেমন একঘেঁয়ে হয়ে যায় আর তরুণেরা তাদের বিষয়ে ধৈর্য্য হারিয়ে
ফ্যালে। আমার সন্তানদের কাছ থেকে আমি তেমন সুখ পাই নি। যেসব নারীরা চেরনোবিলের ঘটনার
পর শহরে গেছে তারা সারাক্ষণই কাঁদছে। হয় তাদের ছেলের বউরা তাদের কষ্ট দিচ্ছে অথবা তাদের
মেয়েরাও তাদের খুব সুখ দিচ্ছে না। তারা ফিরতে চাচ্ছে। আমার স্বামী ত’ এখানেই আছেন।
এখানেই তাঁর কবর। এখানে চিরবিশ্রামে না থাকলে অন্য কোথাও বাস করতেন হয়তো। এখন আমি এখানে
ওর সাথেই থাকব (বৃদ্ধা হঠাৎই খুশি হয়ে যান)। সব কিছু জন্মাচ্ছে, সব কিছু ফুটে উঠছে।
ক্ষুদ্রতম মাছি থেকে অন্য যত পশু-পাখি সবাই। সব কিছুই কি জীবন্ত এখানে।
তোমাদের জন্য আমি সব কিছু মনে রাখব। বিমানগুলো উড়ছে এবং উড়ছে।
প্রতিদিন। তারা আমাদের মাথার উপর দিয়ে খুব নিচু হয়ে উড়ে যায়। ওরা উড়ে যাচ্ছে রিএ্যাক্টর
বা পারমাণবিক চুল্লীর উপর দিয়ে। স্টেশনের কাছে। একটার পর একটা। যখন এখানে আমাদের গ্রাম
ছাড়া করা হচ্ছে। তারা আমাদের তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। বাড়ি বাড়ি গিয়ে হানা দিচ্ছে। মানুষজন
সব চাদরের নিচে গিয়ে লুকোচ্ছে। বাড়ির গৃহপালিত পশুগুলো গোঙ্গাচ্ছে, বাচ্চারা কাঁদছে।
এ যেন একটা যুদ্ধ! এবং সূর্য অস্ত গেছে...আমি বসলাম এবং কুঁড়ে ঘর থেকে বের হয়ে আসিনি,
যদিও এটা সত্য যে আমি তাদের তালা বন্দীও করে রাখি নি। সৈন্যরা দরজায় করাঘাত করলো, ‘মহাশয়া,
আপনি কি সব গুছিয়ে নিয়েছেন?’ আর আমি উত্তর করলাম, ‘আপনারা কি আমার হাত-পা বাঁধতে চান?’
ওরা উত্তরে কিছু বললো না এবং চলে গেল। এই সৈন্যরা বয়সে ছিল তরুণ। নিতান্ত বাচ্চা। তাদের
সামনে বৃদ্ধারা হাঁটু গেড়ে বসে অনুনয় বিনয় করছিল যেন বাড়ি বা গ্রাম ছেড়ে দূরে যেতে
না হয়। সৈন্যরা সেই বৃদ্ধাদের বাহুর নিচ দিয়ে ধরে তুললো এবং গাড়িতে ঠেলে নিয়ে বসাল।
কিন্ত আমি সৈন্যদের বললাম যে আমাকে ছুঁতে এলে খবর আছে। আমি ওদের অভিশাপ দিলাম। আমি
ভালই অভিশাপ দিলাম আর কি। আমি কাঁদি নি। সেদিন আমি কাঁদি নি। আমি আমার ঘরে বসে থাকলাম।
এক মিনিট তারা চীৎকার করেছিল। চীৎকার! আর তারপর সবকিছু শান্ত হয়ে গেল। খুব শান্ত। সেই
দিন- প্রথম দিন যেদিন আমি ঘর ছাড়ি নি।
তারা পরে আমাকে বলেছিল যে সেই রাতের কাফেলার প্রথম সারিটি ছিল
হাঁটতে থাকা মানুষের। পরের সারিটি ছিল গবাদি পশুর। ঠিক যেন যুদ্ধ চলছে দেশে! আমার স্বামী
একটি কথা প্রায়ই বলতে ভালবাসতেন যে মানুষ গুলি করতে পারে কিন্ত ঈশ্বর বুলেট দান করেন।
প্রত্যেকেরই রয়েছে তার নিজস্ব নিয়তি। তরুণেরা যারা গ্রাম ছেড়েছে তাদের কেউ কেউ ইতোমধ্যে
মারা গেছে। তাদের নতুন আবাস স্থলে। অন্যদিকে আমি আজো হাঁটছি। যদিও আগের চেয়ে ধীর লয়ে,
তবু ত’ হাঁটছি। মাঝে মাঝে খুব একঘেঁয়ে লাগে এবং তখন আমি কাঁদি। গোটা গ্রামটিই জনশূণ্য।
এখানে সব ধরণের পাখি আছে। তারা চারপাশে উড়ে চলে। এখানে আছে ইল্ক বা বড়সর হরিণ, যা কিছু
তুমি চাও (বৃদ্ধা কাঁদতে শুরু করেন)।
সব কিছু খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে মনে পড়ছে আজ। প্রত্যেকেই এ গ্রাম ছেড়ে
চলে গেছে তবে তাদের কুকুর এবং বিড়ালগুলো রেখে গেছে। গ্রাম ছেড়ে আমি বাদে সবাই যখন চলে
গেল, প্রথম কয়েকদিন আমি সব বিড়ালকে দুধ খাওয়াতে আর কুকুরগুলোকে রুটি দিতে প্রচুর ঘুরে
বেড়িয়েছি। আহা এই কুকুর কি বিড়ালগুলো সারাটা দিন তাদের যার যার বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে
থাকত কখন মনিব আসে এই অপেক্ষায়! তারা তাদের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেছে। ক্ষুধা পেলে
বেড়ালগুলো শসা খেয়ে ফেলত। ওরা টমেটোও খেত। শরৎ অবধি আমি আমার প্রতিবেশীদের লনের যতœ
নিয়েছি, তাদের বেড়া পর্যন্ত গেছি। কারোর বাড়ির বেড়া পড়ে গেছে ত’ আমি হাতুড়ি দিয়ে ঠুকে
ঠুকে ফের সেই বেড়া ঠিক করেছি। মানুষের জন্য অপেক্ষা করেছি। আমার পড়শির একটি কুকুর ছিল
ঝুচোক নামে। ‘ঝুচোক,’ আমি ডাকতাম, ‘জন-মনিষ্যির দেখা পেলে আমাকে একটি ডাক দিও।’
এক রাতে আমি স্বপ্ন দেখলাম যে আমাকে বাড়ি আর গ্রাম খালি করে
যেতে বলা হচ্ছে। অফিসার হাঁকছে, ‘কাকী! আমরা সব কিছু পুড়িয়ে দিয়ে মাটিতে পুঁতে ফেলব।
বের হয়ে আসুন!’ আর তারপর তারা আমাকে অন্য কোথাও নিয়ে যায়, কোন অজ্ঞাত স্থানে। ঠিক নিশ্চিত
নয় কোথায়। এটা শহর নয়, গ্রামও নয়। এটা এমনকি পৃথিবীরও কোন জায়গা নয়।
একটা সময় আমার একটা মিষ্টি বেড়াল ছানা ছিল। ভাসকা। একবার শীতকালে
ইঁদুরগুলো সত্যি ভারি ক্ষুধার্ত ছিল আর তারা হামলা করছিল। কোথাও যাবার জায়গা ছিল না
আমার। ইঁদুরগুলো বিছানার চাদরের নিচে হামা দিচ্ছিল। একটি গামলায় আমি কিছু শস্যদানা
রেখেছিলাম। ইঁদুরগুলো সেই গামলায় দাঁত দিয়ে কেটে ছিদ্র করল। কিন্ত ভাসকা বাঁচাল আমাকে।
ওকে ছাড়া আমি প্রায় মরতে বসেছিলাম। আমরা কথা বলব। আমি আর আমার বিড়াল ভাসকা। একসাথে
রাতের খাবার খাব। এরপর ভাসকা কোথায় হারালো। ক্ষুধার্ত কুকুরেরা বোধ করি ওকে খেল। কুকুরগুলো
মরা না অবধি ক্ষুধায় দৌড়াত। আর বেড়ালগুলো ত’ ক্ষিদেয় নিজেদের ছানাগুলোকে পর্যন্ত খেয়ে
ফেলত। গ্রীষ্মে নয়, তবে বিশেষ করে শীতে তারা তাদের ছানাদের ত’ খাবেই। হে ঈশ্বর, ক্ষমা
করুন আমাকে!
কখনো কখনো নিজের ঘরের ভেতরটাই পুরো আমি একা হাঁটতে পারি না।
আমার মত এক বৃদ্ধার জন্য গ্রীষ্মকালেও চুল্লী ঠান্ডা ঠেকে। এখানে মাঝে মাঝে পুলিশ এসেছে।
নানা জিনিষপত্র খতিয়ে দেখেছে। তারা আমাকে রুটি এনে দেয়। কিন্ত ওরা কি খুঁজে দেখছে?
এখন আমি এক বুড়ি আর আমার বেড়াল বেঁচে আছি। এটা নতুন একটি আলাদা
বেড়াল। আমরা যখন পুলিশের গলা শুনি, তখন আমরা খুশি হয়ে যাই। আমরা সেখানটা দৌড়ে যাই।
পুলিশ হয়তো আমার বেড়ালটাকে একটা হাড় দেয় খেতে। তারা আমাকে জিজ্ঞাসা করে: ‘যদি ডাকাত
আসে ত’ কি করবে?’
আমি জবাব দিই, ‘ডাকাত এসে আমার কাছ থেকে কি বা পাবে? তারা কি
নেবে? আমার আত্মা? কারণ আত্মা ছাড়া আমার ত’ আর কিছুই নেই।’ ওরা ভাল ছেলে। হাসে। আমার
রেডিওর জন্য ওরা একদিন কিছু ব্যাটারি নিয়ে এলো। এখন আমি ব্যাটারি শুনি। আমি ল্যুদমিলা
জাইকিনা বেশ শুনি। তবে আগের মত অত বেশি গান তিনি এখন আর করেন না। হতে পারে আমার মতই
বয়স হয়েছে তাঁর। আমার স্বামী বলতেন- প্রায়ই বলতেন, ‘নাচ শেষ হয়ে গেছে। এখন বেহালাটা
কেসে তুলে রাখো।’
আমি তোমাদের বলব যে কিভাবে আমি আমার বেড়ালকে খুঁজে পেয়েছিলাম।
আমি আমার ভাসকাকে ত’ হারালাম। একদিন অপেক্ষা করলাম, দু’দিন এবং শেষে গোটা একটি মাস।
তা’ এই হলো সব মিলিয়ে ঘটনা। আমি একদম একা হয়ে গেলাম তখন। কেউ আমার সাথে কথাও বলত না
।আমি গ্রামের চারপাশে ঘুরে বেড়াতাম, অন্য মানুষদের উঠোনে যেতাম আর ডাকতাম: ভাসকা, মুরকা।
ভাসকা! মুরকা! শুরুতে তাদের অনেকে আশপাশে দৌড়াত এবং তারপর তারা কোথাও হারিয়ে যেত। মৃত্যু
ত’ কারো পরোয়া করেনা। পৃথিবী সবাইকে নিয়ে নেয়। কাজেই আমি হাঁটছি এবং হাঁটছি। দু’দিন
ধরে হাঁটছি। তৃতীয় দিনের দিন আমি তাকে একটি দোকানের নিচে দেখলাম। আমরা চোখাচোখি করলাম।
বেড়াল খুশি। আমিও খুশি। কিন্ত সে কিছু বলল না। ‘ঠিক আছে,’ আমি বললাম, ‘আমরা চলো বাড়ি
ফিরি।’ কিন্ত বেড়ালটা সেখানে বসেই রইলো। মিয়াও মিয়াও করছে। সুতরাং আমি তখন বললাম,
‘তুমি এখানে বসে থেকে কি করব? নেকড়েরা তোমাকে টুকরো করে খাবে। বরং আমার সাথে চলো। আমার
কাছে ডিম আছে। কিছু শুকরের চর্বিও আছে।’ কিন্ত ওকে কিকরে এত কিছু ব্যখ্যা করি? বেড়াল
ত’ মানুষের ভাষা বোঝে না। তাহলে কিভাবে আমাকে বুঝবে? আমি সামনে হেঁটে চলি আর বেড়ালটা
আমার পিছ পিছ দৌড়ে যায়। মিয়াও মিয়াও করেই চলেছে। ‘আমি তোমাকে কিছু চর্বির টুকরো কেটে
খেতে দেব।’ মিয়াও। ‘আমরা দু’জন একসাথে বাঁচব।’ মিয়াও। ‘আমি তোমাকেও ভাসকা নামে ডাকব।’
মিয়াও। সেই থেকে আজ দু’টো শীত আমি এই বেড়ালটার সাথে বেঁচে আছি।
মাঝে মাঝে খুব একঘেঁয়ে লাগে আর তখন আমি কাঁদি।
আমি কবরখানায় যাই। আমার মা সেখানে রয়েছেন। আমার ছোট মেয়ে। যুদ্ধের
সময় সে টাইফাস রোগে ভুগেছে। তারপর আমরা তাকে কবরখানায় নিয়ে গেলাম, কবর দিলাম এবং তারপর
সূর্য বের হয়ে এলো মেঘের আস্তর ভেদ করে। এবং সূর্য ঝলমল করে উঠলো। সূর্য যেন আমাকে
বোঝাতে চাইলো: তোমার যাওয়া উচিত এবং ওকে কবর খনন করে সমাধিস্থ করা উচিত। আমার স্বামী
সেখানে। ফেদিয়া। আমি ওদের সবার সাথে বসে থাকি। অল্প দীর্ঘশ্বাস ছাড়ি। তুমি মৃতের সাথে
ততটাই কথা বলতে পারো যতটা জীবিতের সাথে বলতে পারো। এ দু’য়ের কোন প্রভেদ আমার মাঝে নেই।
আমি দু’জনকেই শুনতে পাই। যখন তুমি একা...যখন তুমি বিষণœ। যখন তুমি খুবই দু:খী।
ইভান গাভ্রিলেঙ্কো। তিনি ছিলেন শিক্ষক ও কবরখানার ডানদিকের
নিকটতম প্রান্তে তিনি বাস করতেন। তিনি ক্রিমিয়া চলে গেলেন। তাঁর ছেলে সেখানেই ছিল।
তাঁর কাছেই ছিল পিওতর মিউসিকি। তিনি একটি ট্রাক্টর চালাতেন। তিনি ছিলেন একজন স্তাখানোভাইত,
সেসময়টা সবাই স্তাখানোভাইত হতে চাচ্ছিলো। তাঁর হাত ছিল যাদুকরী। তিনি কাঠ থেকে লেস
প্রস্তত করতে পারতেন। তাঁর বাড়িটি ছিল গোটা একটি গ্রামের আয়তনের মাপে। ওহ, যখন সৈন্যরা
তাঁর বাড়িটি ভেঙ্গে ফেললো, আমার এত খারাপ লাগলো যে রক্ত টগবগ করে ফোটা শুরু হলো। তারা
বাড়িটা ভেঙ্গে মাটি চাপা দিল। অফিসার চিৎকার করছিল: ‘এটার কথা আর চিন্তা করো না, দিদা!
এই বাড়িটা একটা গরম তাতানো চুলার উপর!’ অফিসারটি মাতাল ছিল। এদিকে পিওতর তখন কাঁদছে।
বলছে, ‘দিদা- চলে যান বরং। যা হয়েছে হয়েছে!’ সে আমাকে চলে যেতে বললো। এরপরের বাড়িটাই
মিশা মিখালেভের। সে খামারবাড়িতে কেটলি গরম করার কাজ করতো। সে দ্রুতই মারা গেছিলো। এখানে
পরিত্যক্ত এবং দ্রুতই জীবনাবসান হলো তার। তার বাড়ির কাছে ছিল স্তেপা বাইখভের বাড়ি।
তিনি ছিলেন পেশায় জীববিজ্ঞানী। তাঁর বাড়িটা পুড়ে গেল! কিছু মন্দ মানুষ রাতের বেলা তাঁর
বাড়িটি পুড়িয়ে ফেললো। স্তেপাও বেশিদিন বাঁচে নি। মোগিলেভ অঞ্চলে তাঁকে কবর দেয়া হলো।
যুদ্ধের সময় আমরা কত মানুষ যে হারিয়েছি! ভাসিলি কোভালেভ, মাক্সিম নিকোফোরেঙ্কো। তারা
বাঁচছিল, সুখী হয়েছিল। ছুটির দিনে তারা গান গাইবে, নাচবে। হার্মোনিকা বাজাবে।
আর এখন ত’ সবকিছু একটা জেলখানার মত। মাঝে মাঝে আমি আমার চোখ
বুঁজব এবং গ্রামের ভেতর দিয়ে যাব- আমি তাদের জিজ্ঞাসা করব, ‘তেজষ্ক্রিয়তা কি? একটি
প্রজাপতি উড়ছে, মৌমাছিগুলো গুঞ্জন করছে। আর আমার ভাসকা ইঁদুর ধরছে (বৃদ্ধা কান্না শুরু
করেন)।’
ওহ ল্যুবোচকা, তুমি কি বুঝছো আমি তোমাকে কি বলছি? আমার সব হাহাকার?
তুমি এসব কিছুই মানুষের কাছে নিয়ে যাবে। আমি হয়তো এখানে আর বেশিদিন থাকব না ।আমি মাটির
নিচে চলে যাব। শেকড়ের নিচে।
: জিনাইদা কোভালেঙ্কো,
পুনরায় বসতি স্থাপনকারী।
লিখিত একটি গোটা জীবন
সংক্রান্ত একাকী সংলাপ
দরজা
এই ঘটনাটি আমার সাথে দশ বছর আগে ঘটেছিল আর প্রতিদিনই ঘটে।
আমরা বাস করতাম প্রিপিয়াত শহরে। সেই শহরে।
আমি আসলে কোন লেখক নই। আমি এটা বর্ণনা করতেও সক্ষম হব না। আজো
গোটা ঘটনাটি আমি পুরোপুরি বুঝেও উঠতে পারি নি। আমার বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা দিয়েও এটি
পুরোপুরি আত্মস্থ করা সম্ভব নয়। ধরো তুমি একজন সাধারণ, স্বাভাবিক মানুষ। ছোট একজন মানুষ।
আর দশজনের মতোই। তুমি কাজে যাও, কাজ থেকে ঘরে ফেরো। গড়পরতা একটি বেতন পাও। বছরে একবার
তুমি ছুটি কাটাতে যাও। তারপর একদিন হঠাৎ করে তুমি হয়ে গেলে একজন চেরনোবিল ব্যক্তি।
একটি অদ্ভুত প্রাণী যার ব্যপারে সবাই আগ্রহী অথচ কেউই তার ব্যপারে কিছু জানে না। তুমি
আর সবার মত হতে চাও, তবে এখন আর তুমি অন্যদের মত হতে পার না। মানুষ আজ তোমার দিকে অন্যরকম
ভাবে তাকায়। তারা তোমাকে জিজ্ঞাসা করে: এটা কি খুব ভয়ানক ছিল? আণবিক স্টেশনটি কিভাবে
পুড়ে গেল? তুমি কি দেখলে? এবং আরো যে প্রশ্নটি তুমি জানো তারা করে, সেটি হলো, তুমি
কি আর সন্তানের জন্ম দিতে পার? তোমার বউ কি তোমাকে ছেড়ে গেছে? শুরুতে ত’ আমরা সবাই
যেন জানোয়ারে পরিণত হয়ে গেছিলাম। ‘চেরনোবিল’ শব্দটিই যেন একটি সঙ্কেত। শব্দটি শুনলেই
সবাই ঘাড় ঘুরিয়ে তোমার দিকে তাকায়। আরে এই লোকটি কিনা চেরনোবিল থেকে এসেছে!
শুরুতে এমনটাই ছিল সবকিছু। আমরা শুধু একটি শহর হারাই নি, হারিয়েছি
আমাদের গোটা জীবন। ঘটনার পর তৃতীয় দিনের দিন আমরা শহর ছাড়লাম। রিএ্যাক্টরে বা পারমাণবিক
চুল্লীতে ত’ আগুন ধরেছিল। মনে পড়ে একবার এক বন্ধু আমার সম্পর্কে বলছিল, ‘আরে- এর গায়ে
ত’ রিএ্যাক্টরের গন্ধ!’ সেই গন্ধকে ব্যখ্যা করা যায় না। কিন্তÍ কাগজগুলো সেসব বিষয়ে
তখনি লিখছিল। তারা গোটা চেরনোবিলকে একটি আতঙ্কের বাড়িতে পরিণত করছিল। যদিও বাস্তবিক
অর্থে চেরনোবিলকে তারা কার্টুনে পরিণত করতে পেরেছিল। আমি শুধু বলতে যাচ্ছি আমার ক্ষেত্রে
যা যা ঘটেছিল সেসব কথা। আমার নিজস্ব সত্য।
ঘটনাটা ছিল এমন: ওরা বেতারে ঘোষণা দিল যে তুমি বেড়ালের যতœ
নিতে পার না। সুতরাং আমরা বেড়ালটাকে একটি স্যুটকেসে ভরে নিল। কিন্তÍ বেড়ালটা যেতে চাইছিল
না। ও স্যুটকেস বেয়ে লাফিয়ে উঠছিল। সবাইকে আঁচড়ে দিচ্ছিল। এদিকে কর্তৃপক্ষ থেকে আমাদের
বলা হচ্ছিল যে আমরা আমাদের জিনিষপত্র কিছু সাথে নিতে পারব না। শুধুমাত্র একটি/দু’টো
জিনিষ সাথে নিতে পারব। মাত্র একটি! ভাবলাম আমার এ্যাপার্টমেন্টের দরজা ভেঙ্গে তবে সাথে
করে নিয়ে যাব। আমি দরজা ফেলে যেতে পারব না। বদলে আমার ঘরে ঢোকার পথ একটা কিছু দিয়ে
ঢেকে যাব। কারণ আমার বাড়ির দরজা- সেখানে ছিল একটি যাদু পাথর, আমাদের একটি পারিবারিক
স্মারক। আমার বাবা এই দরজার পারেই চির শায়িত হন। আমি জানি না এই ঐতিহ্য কোথাকার- তবে
অন্য সব জায়গার মত ত’ অবশ্যই নয়- তবে আমার মা বলেছিলেন যে বাড়িতে কেউ মারা গেলে মৃতের
শবদেহ তার বাড়ির দরজার উপর একবার রাখতেই হবে। সে সেখানেই শুয়ে থাকে যতক্ষণ না তার কফিন
আনা হয়। আমি আমার বাবার পাশে সারা রাত বসে ছিলাম। তিনি এই দরজায় শুয়ে ছিলেন। ঘরটি খোলা
ছিল। সারা রাত। এবং এই দরজার উপর সামান্য কিছু অঙ্কণ প্রচেষ্টার চিহ্ন আছে। আমি বড়
হবার সময় এই আঁকাআঁকিগুলো করেছি: প্রথম শ্রেণী বা দ্বিতীয় শ্রেণী থেকে সপ্তম শ্রেণীতে
পড়া অবধি সময়ে। সেনাবাহিনীর সামনে। এবং তারপর: যখন আমার ছেলে বড় হলো। মেয়ে বড় হলো।
আমার গোটা জীবনটাই এই বাড়ির দরজায় লেখা। কিকরে সেই বাড়ির দুয়ার ছেড়ে যাই?
আমি আমার প্রতিবেশীকে সাহায্যের জন্য অনুরোধ করলাম। তার একটি
গাড়ি ছিল। বললাম: ‘আমাকে একটু সাহায্য করো।’ সে তার মাথা নেড়ে এমন একটি ভঙ্গী করলো
যার অর্থ দাঁড়ায়, তুমি ত’ পুরোপুরি সুস্থ নও। সুস্থ কি? কিন্ত আমি আমার সাথে দরজাটা
নিলাম। একটি মোটর সাইকেলে করে। সেই বনের ভেতরের পথ দিয়ে। দু’বছর পর যতক্ষণে আমাদের
এ্যাপার্টমেন্ট পুরোটাই লুণ্ঠিত এবং শুণ্য হয়ে গেছে, তখন পুলিশ আমাকে ধাওয়া করছিল,
‘তোমাকে আমরা গুলি করবো! গুলি করবো!’ এভাবেই আমি আমার নিজের ঘর থেকে দরজা চুরি করেছি।
আমি আমার কন্যা এবং স্ত্রীকে নিয়ে হাসপাতালে গেলাম। ওদের গোটা
শরীরে কালো কালো দাগ। এই দাগগুলো দেখা দেবে এবং তারপর মিলিয়ে যাবে। খানিকটা পাঁচ কোপেক
মুদ্রার মত দাগ। তবে কিছুই আহত করে না। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আমার স্ত্রী ও কন্যাকে কিছু
পরীক্ষা-নিরীক্ষা করলো। আমি যখন ওদের মেডিক্যাল চেক-আপের রিপোর্ট চাইলাম, তখন আমাকে
বলা হলো: ‘এটা তোমার জন্য নয়।’ আমি বললাম, ‘তবে কিসের জন্য?’
ফেরার পর সবাই বলছিল: ‘আমরা মরতে যাচ্ছি, আমরা মরতে যাচ্ছি।
২০০০ সাল নাগাদ একজন বেলারুশীয়ও আর বেঁচে থাকবে না।’ আমার মেয়ের বয়স ছিল ছয় বছর। আমি
ওকে বিছানায় ঘুম পাড়াতে নিয়ে যাচ্ছি আর ও আমাকে বলছে: ‘বাবা, আমি বাঁচতে চাই। আমি ত’
এখনো ছোট।’ অথচ আমি ভাবতাম ও কিছুই বোঝে না!
তুমি কি এই ছবিটা চাইলেও আঁকতে পারবে? সাতটি ন্যাড়া মাথা ছোট
মেয়ে একটি কক্ষে রয়েছে? হাসপাতাল কক্ষে ওরা সাতটি বাচ্চা মেয়ে ছিল...ওহ্, যথেষ্ট হয়েছে!
আমি যখন এই বিষয়ে কথা বলি প্রতিবারই আমার অনুভূতি হয়- আমার হৃদয় আমাকে বলে- তুমি তাদের
প্রতারণা করছো। কারণ গোটা বিষয়টি আমাকে এমন ভাবে বলতে হয় যেন আমি একজন আগন্তÍক। আমার
স্ত্রী হাসপাতাল থেকে বাসায় ফিরে এলো, ‘আমাদের ছোট মেয়েটা যত কষ্ট পাচ্ছে তার থেকে
বরং ও মরে যাক। কিম্বা আমার মরণ হোক যেন আমাকে এসব আর দেখতে না হয়।’ না, যথেষ্ট হয়েছে!
আমি কোন কথা বলার মত অবস্থাতেই নেই। না।
আমরা আমাদের ছ’বছরের মেয়ের মৃতদেহও দরজার উপরে রেখেছিলাম (যেখানে
আমার বাবার মৃতদেহও রেখেছি তাঁর মৃত্যুর পর) যতক্ষণ না ওরা মেয়েটির জন্য একটি কফিন
নিয়ে আসে। একটি ছোট্ট কফিন। একটি বড় পুতুলের জন্য যেমন বাক্স লাগে তেমনটাই।
আমি সাক্ষ্য দিতে এসেছি: আমার মেয়ে চেরনোবিল দূর্ঘটনায় মারা
গেছে। অথচ ওরা চায় আমরা সব ভুলে যাই।
নিকোলাই কালুগিন, বাবা।
সৈন্যদের কোরাস
আরতিয়ম বখতিয়ারভ, ব্যক্তিগত; ওলেগ ভরোবে, লিক্যুইডেটর; ভাসিলি
গুসিনোভিচ, গাড়িচালক এবং স্কাউট; গেন্নাদি দেমেনেভ, পুলিশ অফিসার; ভিতালি কার্বালেভিচ,
লিক্যুইডেটর; ভালেন্তিন কমকভ, গাড়িচালক এবং প্রি-ভোট; এডুয়ার্ড করোতকভ, হেলিকপ্টার
পাইলট; ইগর লিতভিন, লিক্যুইডেটর; ইভান লুকাশুক, প্রাইভেট; আলেক্সান্দর মিখাইলোভিচ,
গিজার চালক; মেজর ওলেগ পাভলভ, হেলিকপ্টার পাইলট; আনাতোলি রিবক, একটি গার্ড রেজিমেন্টের
কমান্ডার; ভিক্টর স্যাঙ্কো, প্রাইভেট; গ্রিগরি খভরোস্ট, লিক্যুইডেটর; আলেক্সান্দর শিঙ্কেভিচ, পুলিশ অফিসার; ভøাদিমির শভেদ, ক্যাপ্টেন;
আলেক্সান্দর ইয়াসিনিস্কি, পুলিশ অফিসার।
আমাদের রেজিমেন্টকে বিপদ সঙ্কেত দেয়া হলো। আমরা জানতাম না যে
আমাদের বিয়েলোরুশিয়ায় চেরনোবিলের তেজষ্ক্রিয়তাজনিত ক্ষয়-ক্ষতি পরিষ্কার করতে যেতে হবে।
আমরা যখন মস্কোতে বেলোরুশস্কায়া রেল স্টেশনে কর্তৃপক্ষের নির্দেশমত পৌঁছলাম, কেবল তখনি
উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষ জানালেন যে আমাদের চেরনোবিলের ওখানে যেতে হবে। একজন সৈন্য আমার
ধারণা সে লেনিনগ্রাদ থেকে এসেছে, আণবিক তেজষ্ক্রিয়াগ্রস্থ এলাকায় যাবার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ
করা শুরু করলো। তখন তাকে বলা হলো যে তাকে টেনে-হিঁচড়ে সামরিক ট্রাইব্যুনালে নিয়ে যাওয়া
হবে। কমান্ডার গোটা বাহিনীর সামনে তাকে বললেন, ‘আপনাকে জেলে যেতে হবে অথবা গুলি করা
হবে।’ তবে আমার আবার ঐ ব্যক্তির মত মনে হয় নি। আমি বীরত্বমূলক কিছু করতে চাচ্ছিলাম।
বাচ্চাদের মত। আমার মত অন্যরাও সেখানে ছিল। একটু ভয় ভয় লাগছিল তবে মজাও লাগছিল।
সুতরাং আমাদের নিয়ে যাওয়া হলো। আণবিক স্টেশনের কাছে। আমাদের
সাদা পোশাক এবং সাদা টুপি দেয়া হলো। আর গজ কাপড়ের সার্জিক্যাল পোশাক। আমরা গোটা এলাকা
পরিষ্কার করলাম। আণবিক স্টেশনের রোবটগুলোকে দিয়ে কোন কাজ হলো না। বিষ্ফোরণের পর ওদের
গোটা সিস্টেমে গোলমাল ধরা পড়ে। তবে আমরা সৈন্যরা খুব কাজ করলাম। সেকথা ভেবে গর্ব হয়।
আমরা চলছিলাম- একটি জায়গায় এসে দেখি একটি চিহ্ন যেখানে লেখা
‘জোন অফ সীমানা।’ আমি কখনো যুদ্ধে যাই নি তবে যুদ্ধের ভেতর থাকার মত একটি অনুভূতি হলো।
অন্য কোন অভিজ্ঞতা থেকে আমি এটা স্মরণ করছিলাম। কোথা থেকে? বোধ করি গোটা পরিস্থিতিকে
আমি মৃত্যুর সাথে অন্বিত করছিলাম, কিছু কিছু কারণে.............
রাস্তায় আমরা কিছু পাগল হয়ে যাওয়া কুকুর ও বিড়াল দেখলাম। তারা
অদ্ভুত ব্যবহার করছিল: তারা আমাদের ঠিক যেন মানুষ হিসেবে চিনতে পারে নি, তারা দৌড়ে
গেছিল। আমি বুঝতে পারছিলাম না যে ওদের কি সমস্যা হয়েছে যতক্ষণ না পর্যন্ত ঐ কুকুর আর
বিড়ালগুলো আমাদের দিকে চীৎকার করা শুরু করলো...ঘরগুলো সব সীল গালা করা হলো, খামারের
যন্ত্রপাতি সব পড়ে রইলো। পরিত্যক্ত হলো। দেখতে সত্যিই চমকপ্রদ। চারপাশে কেউ নয়। শুধু
রাস্তায় কিছু পুলিশ টহল দিচ্ছে। চারপাশে স্তÍপাকৃতি সব নথি-পত্র থাকবে: জনগণের কমসোমল
(কম্যুনিস্ট যুবক লীগ) পরিচয়পত্র, সণাক্তকরণের অন্য যত পদ্ধতি, পুরষ্কার। একটি জায়গায়
আমরা কিছুক্ষণের জন্য একটি টেলিভিশন নিয়ে গেলাম- আমরা এটা ধার করেছিলাম- ধরুন-তবে সত্যি
বলতে যতক্ষণ পর্যন্ত কেউ কেউ কোন না কোন জিনিষ তাদের বাসায় নিয়ে যাচ্ছিল, আমি সেসব
বস্তÍ দেখি নি। প্রথমত: আমার মনে হয়েছে যে এই যে মানুষগুলো আজ চলে যাচ্ছে তারা আবার
ফিরে আসবে। দ্বিতীয়ত: এই বিষয়গুলো কোন না কোনভাবে মৃত্যুর সাথে সম্পর্কিত।
মানুষজন সব গাড়ি চালিয়ে যেখানে রিএ্যাক্টর বিষ্ফোরিত হয়েছে
সেখানে গেল। তারা চেয়েছিল সেখানে নিজেদের ছবি তুলতে আর বাড়ি ফিরে পরিবার-পরিজনকে সে
ছবি দেখাতে। তারা ভীত ছিল তবে একইসাথে কৌতুহলী ছিল: আসলে ঠিক কি ঘটেছে? আমি নিজে সেখানে
যাই নি, কারণ আমার এক তরুণী বধূ ছিল, আমি এজন্য কোন ঝুঁকি নিতে চাই নি, কিন্তÍ সৈন্যরা
মাটিতে কিছু গুলি ছুঁড়লো এবং চলে গেল। সুতরাং...(নীরবতা)।
গ্রামের রাস্তা, ক্ষেত, হাইওয়ে...সবকিছুই কেমন নির্জন! কোন
জনমানুষ নেই। হাইওয়েটি যেন কোথাও যাচ্ছে না। খুঁটির উপর বৈদ্যুতিক তারগুলোরও যেন কোথাও
পৌঁছনোর নেই। শুরুতে বাড়িগুলোতে তা-ও কিছু আলো জ্বলতো, পরে সেসব আলোও নিভিয়ে ফেলা হয়।
আমরা গাড়ি চালিয়ে যাব এবং স্কুল দালান থেকে হঠাৎই একটি বন্য শুকর আমাদের দিকে লাফিয়ে
পড়বে। কিম্বা একটি খরগোশ। সর্বত্রই মানুষের বদলে পশু-পাখি: বাসায়, স্কুলে, ক্লাবে।
এখনো নানা জায়গায় পোস্টার ঝুলছে: ‘আমাদের লক্ষ্য হলো গোটা মানবজাতির উন্নয়ন।’ ‘বিশ্বের
সর্বহারা অবশ্যই জয়ী হবে।’ ‘লেনিনের আদর্শের মৃত্যু নেই।’ অতীতের দিনগুলোর কথা ভাবুন
একবার! যৌথ খামারের অফিসগুলোতে লাল পতাকা ঝুলছে, নতুন ব্র্যান্ডের সব মস্তকাবরণ, বড়
নেতাদের ছবিসহ ছাপানো ব্যানারের থোকা থোকা স্তÍপ। দেয়ালে দেয়ালে- নেতাদের ছবি; ডেস্কের
উপর- নেতাদের আবক্ষ ছবি। যুদ্ধের স্মারক যেন। কোন গ্রাম্য গির্জার উঠোন চত্বর, ধূসর
সিমেন্টের গোশালা, ট্রাক্টর মেকানিকের দোকান। কবরখানা আর ক্ষতিগ্রস্থ মানুষ। ঠিক যেন
বা একটি যুদ্ধরত গোত্র তাড়াহুড়োয় তাদের ঘাঁটি ছেড়ে কোথাও গেছে আর তারপর সত্যি সত্যি
কোথাও পালিয়ে আছে।
আমরা এ ওকে জিজ্ঞাসা করবো: এই কি তেমনটা যেমনটা আমরা আমাদের
জীবন হোক বলে চেয়েছি? এই প্রথম বাইরে থেকে আমরা আমাদের জীবনকে দেখছি। প্রথমবারের মত।
এই বাইরে থেকে দেখার ফলে একটি সত্যিকারের ধারণা হয় আমাদের নিজেদের জীবন বিষয়ে। মাথায়
একটি আঘাতের মত। ঐ যে একটি দারুণ রসিকতা আছে না? কিয়েভের বানানো একটি পারমাণবিক পিঠের
অর্দ্ধ-জীবন যেন মাত্র ছত্রিশ ঘণ্টা। সুতরাং...এবং আমার জন্য? এই পারমাণবিক বিষ্ফোরণের
ধাক্কা সামলাতে লেগে গেল তিনটি বছর। তিন বছর পর আমি আমার পার্টি কার্ড ফেরত দিলাম।
আমার ছোট্ট লাল বই। আমি আমার অঞ্চলে মুক্ত হয়ে গেলাম। চেরনোবিল আমার মনকে নাড়া দিয়েছে।
পার্টির বাঁধা গৎ চিন্তা ভেঙ্গে আমি মুক্ত হলাম।
এখানে সেই পরিত্যক্ত বাড়িটি। এটা বন্ধ হয়ে আছে। জানালার উপর
একটি বেড়াল বসে। আমার মনে হলো এটি কি মাটির তৈরি কোন বেড়াল নাকি? কাছে এসে দেখলাম,
না- এটি একটি সত্যিকারের বেড়াল। সে ঘরের সব ফুল খেয়ে ফেলেছে। জেরানিয়াম। বেড়ালটি কিকরে
এই বাড়ির ভেতর ঢুকলো? অথবা এ বাড়ির মানুষেরা সব চলে যাবার সময় কি বেড়ালটাকে এখানে রেখে
গেছে?
দরজার উপর একটি ছোট্ট কাগজের চিরকুট: ‘প্রিয় সহৃদয় ব্যক্তি,
দয়া করে এখানে মূল্যবান জিনিষ-পত্র কিছু খুঁজবেন না। আমাদের তেমন মূল্যবান কোন জিনিষ-পত্র
কখনো ছিলও না। আপনাদের যা খুশি চাহিদা মাফিক ব্যবহার করতে পারেন, তবে জায়গাটি নোংরা
করেন না।’ আশপাশের অন্যান্য বাড়িগুলোতেও নানা রঙে আঁকা নানা চিহ্ন দেখলাম- ‘প্রিয় বাড়ি,
আমাদের ক্ষমা করো!’ বাড়ি ছেড়ে যাবার সময় বাড়িগুলোর কাছে এমন ভাবে মানুষ বিদায় চেয়েছে
যেন তারা জ্যান্ত মানুষ। কোথাও তারা দেয়ালের গায়ে লিখেছে: ‘আমরা সকালবেলা বাড়ি ছেড়ে
যাচ্ছি,’ অথবা ‘আমরা রাতে চলে যাচ্ছি।’ এবং এমন দেয়াল লিখনের পাশে তারা এমনকি তারিখ
এবং সময়ও দিয়ে দিচ্ছে। স্কুলের নোটবুক কাগজে তারা চিরকূট লিখছে: ‘আমাদের বেড়ালটাকে
মেরো না। নইলে ত’ ইঁদুরেরা সবকিছু খেয়ে ফেলবে।’ এবং তারপর আবার কোন শিশুর হাতের লেখায়:
‘আমাদের ঝুলকাকে তোমরা মেরো না। সে একটা চমৎকার বেড়াল।’ (সাক্ষাৎকার দাতা এপর্যায়ে
তাঁর চোখ বুঁজে ফ্যালেন)। আমি সব কিছু ভুলে গেছি। আমার শুধু মনে পড়ে যে আমি সেখানে
গেছিলাম আর তারপর আর কিছুই মনে পড়ে না। আমি টাকা গুনতে পারিনা। আমার স্মৃতি খুব ভাল
নয়। চিকিৎসকরা সব কিছু বোঝেন না। আমি হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে যাই। কিন্তÍ একথা আমার
মাথায় গেঁথে থাকে: তুমি বাড়ি পর্যন্ত হেঁটে চলেছো, তুমি ভাবছ যে বাড়িটা পুরো খালি,
আর তারপর দরজা খুলে দেখি সেই বিড়ালটা। এবং তারপর সেই চিরকূট।
আমাকে ডাকা হলো। আমার দায়িত্ব ছিল পরিত্যক্ত এলাকাগুলোয় তাদের
আদি অধিবাসীদের ফিরতে না দেয়া। আমরা রাস্তায় অবরোধ দিলাম, পর্যবেক্ষণ খুঁটি নির্মাণ
করলাম। নানা কারণেই মানুষ আমাদের ‘পার্টিজান’ বলতো। এটা যুদ্ধের সময় এবং আমরা সেখানে
দাঁড়িয়ে ছিলাম আমাদের যাবতীয় সামরিক অবসাদ নিয়ে। কৃষকরা বুঝতে পারছিল না যে কেন তারা
তাদের নিজেদের উঠোন থেকে একটি বালতি, কিম্বা একটি কলস, কুড়–ল বা করাত নিতে পারবে না?
কেন তারা তাদের নিজেদের ফসল কাটতে পারবে না? একথা ওদের বুঝিয়ে বলিই বা কিকরে? এবং ব্যৗপারটা
অনেকটা এমন দাঁড়ালো যে রাস্তার একদিকে সৈন্যরা সবাইকে সরিয়ে রাখছে আর অন্য দিকে গরু
চরছে, ফসল কাটতে চাষারা ভিড় জমিয়েছে, শস্য জাহাজে তোলা হচ্ছে। বৃদ্ধা নারীরা বের হয়ে
এসে জোরে জোরে বলবে: ‘ছেলেরা, আমাদের ঢুকতে দাও। এ ত’ আমাদেরই জমি। আমাদের বাড়ি।’ এই
বৃদ্ধারা তাদের ডিম, শুকরের মাংস আর ঘরে বানানো ভদকা নিয়ে আসবে। তারা তাদের বিষাক্ত
হয়ে যাওয়া জমি নিয়ে কান্না-কাটি করত। কাঁদত বাড়ির আসবাবপত্র এবং অন্য সব জিনিষ নিয়ে।
আপনার মত তখন বিচলিত হবে। চারপাশের আইন-শৃঙ্খলা ভেঙ্গে পড়েছে।
একটি নারী তার গরুর দুধ দুইবে এবং তার পাশেই এক সৈনিক দাঁড়িয়ে থাকবে। নারীটির দুধ দোয়ানো
হয়ে গেলেই সৈনিকটি সেই দুধ মেঝেতে ফেলে দেবে। এক বৃদ্ধা হয়ত এক ঝুড়ি ডিম নিয়ে যাচ্ছেন।
কিন্তÍ তার পাশেই খাড়া আর এক যুবক সৈনিক। বৃদ্ধার হাত থেকে ডিমগুলো নিয়ে সেগুলো সে
মাটিতে পুঁতে ফেলবে। চাষীরা আলু তুলছিলো মাটি খুঁড়ে। নি:শব্দে আলু তুলছিলো তারা। কিন্ত
সেগুলো আবার দ্রুতই মাটিতে পুঁতে ফেলাটাও দরকার পড়েছিলো। তবে সবচেয়ে খারাপ দিক হলো,
যা একদমই বোঝা যাচ্ছিল না, সেটা হলো চারপাশের নিসর্গ আর মানুষজন আপাত:দৃষ্টে এই পারমাণবিক
বিষ্ফোরণের পরও ছিল দূর্দান্ত সুন্দর! আর এটাই ছিল বাস্তবে ঘটনার মন্দতম দিক। চারপাশের
সবকিছু এত সুন্দর। জীবনে কখনো এত চমৎকার সব মানুষ আমি আর কোথাও পাব না। প্রত্যেকের
মুখই সুন্দর। তাদের প্রত্যেকের মুখচ্ছবি। আমাদের মুখচ্ছবি।
আমি একজন সৈনিক। আমাকে কিছু করার জন্য নির্দেশ করা হলে আমাকে
সেটা করতেই হয়। তবে পাশাপাশি নিজেকে সৈনিক বীরপুরুষ হিসেবে দেখার বাসনাও আমার ছিল।
তোমার ত’ এটা করার কথাই ছিল। রাজনৈতিক কর্মীরা বক্তৃতা দিত। বেতার ও টেলিভিশনে নানা
রকম অনুষ্ঠান। সমাজের নানা প্রকৃতির মানুষ নানা ভাবে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছিল: কেউ
চাইত তাদের সাক্ষাৎকার নেওয়া হোক কি তাদের চেহারা টিভিতে দেখানো হোক, কেউ আবার বিধ্বস্ত
চেরনোবিলে কাজ করাটাকে তাদের চাকরি হিসেবেই দেখত, এবং তৃতীয় একটি শ্রেণীর মানুষ ছিল-
আমি এ ধরণের মানুষও দেখেছি- যারা পারমাণবিক বিষ্ফোরণে ধ্বস্ত চেরনোবিলে কাজ করে ভাবত
যে তারা কোন ‘বীরত্বব্যঞ্জক’ কাজ করছে। আমরা ভালই বেতন পেতাম. তবে ব্যপারটা এমন ছিল
যেন এসব বেতন-টেতনে কিছু যায় আসে না। আমার বেতন এ¤িœতে ছিল ৪০০ রুবল। কিন্তÍ চেরনোবিলে
কাজ করার সময় আমার বেতন হয়ে গেছিল ১,০০০ রুবল (মানে সেই সোভিয়েত আমলের রুবলের হিসেবে)।
পরে মানুষেরা আমাকে দেখিয়ে বলতো, ‘ওরা যারা চেরনোবিলে কাজ করেছে তারা ত’ বস্তা বস্তা
টাকা পেয়েছে আর এখন ফিরে এসেছে। ওরা সবার আগে গাড়ি পায়, আসবাব পত্র পায়।’ এসব কথায়
কেমন যে কষ্ট হতো! এছাড়া কাজের বীরত্বের দিকটি অবশ্য ছিল।
চেরনোবিল যাবার আগে আমার ভেতর খানিকটা ভয় ছিল। অল্প কিছু সময়ের
জন্য। তবে সেখানে যাবার পর আমার ভয় কেটে গেল। চারপাশে সবটাই সুবিন্যস্ত শৃঙ্খলা, কাজ,
দায়িত্ব। আমি উপর থেকে, একটি হেলিকপ্টার থেকে রিএ্যাক্টরটা দেখতে চাইলাম- বাস্তবিক
এখানে কি ঘটেছে সেটা দেখতে চেয়েছিলাম। কিন্ত এমনটা করা নিষিদ্ধ ছিল। আমার মেডিক্যাল
কার্ডে লেখা ছিল যে আমার দেহে ২১ রোয়েন্টজেন রয়েছে। তবে আমি ঠিক নিশ্চিত নই যে সংখ্যাটি
ঠিক বললাম কিনা? গোটা প্রক্রিয়াটি ছিল খুব সাদা-সিধা: তুমি প্রদেশের রাজধানীতে উড়ে
যাও, চেরনোবিল নামের ছোট্ট শহরটিতে (একটি ছোট প্রাদেশিক শহর এবং আমি যেমনটা কল্পনা
করেছিলাম তেমন বড় কোন শহর এটি আদৌ নয়) এক ব্যক্তি মূল আণবিক স্টেশন থেকে ১০-১৫ কিলোমিটার
দূরে একটি ডোসিমিটার হাতে চারপাশের তেজষ্ক্রিয়তা পরিমাপ করছে। এরপর আমরা প্রতিদিন বিমানপথে
যতটা উড়ব সেই কয় ঘণ্টার সাথে এই পরিমাপ ফল গুণ করা হবে। কিন্ত আমি সেখান থেকে রিএ্যাক্টরের
দিকে যাব এবং কোনদিন রোয়েন্টজেনের পরিমাণ জানব ৮০ আবার কোনদিন জানব ১২০। কোন কোন রাতে
আমি দু’ঘন্টা ধরে রিএ্যাক্টরের চারপাশ ঘিরে বৃত্তাকারে টহল দিই। ইনফ্রারেড আলোর সাহায্যে
আমরা রিএ্যাক্টরের ছবি তুলেছি, তবে ছবির ফিল্মের উপর ছড়ানো ছিটানো টুকরো টুকরো গ্র্যাফাইট
যা বিকীরিত হচ্ছিল- এগুলো দিনের বেলায় চোখে দেখা যায় না।
আমি কিছু বিজ্ঞানীর সাথে কথা বললাম। একজন আমাকে বললেন, ‘আমি
জিহ্বা দিয়ে তোমার হেলিকপ্টার মুছে দেব। কিন্তÍ আমার কিচ্ছু হবে না।’ আর এক বিজ্ঞানী
বললেন, ‘তুমি কোন নিরাপত্তা ব্যবস্থা না নিয়েই ঘুরে বেড়াচ্ছো কেন? তোমার বেশি দিন বাঁচার
ইচ্ছে নেই? খুব বড় ভুল করছো! নিজেকে ঠিকঠাক মত আবৃত করো।’ হেলিকপ্টারে বসার আসনগুলোয়
আমরা সীসা দিয়ে রেখা টানলাম, সীসা আবরণ করে এমন কিছু বক্ষাবরণী কিনলাম। কিন্তÍ ব্যপারটা
এমন দাঁড়ালো যে এতে এক ধরণের আলোকরশ্মি থেকে যদি বা বাঁচা যায়, আর এক ধরণের আলোকরশ্মি
থেকে কোনমতেই বাঁচা যায় না। আমরা সকাল থেকে রাত অবধি উড়ে চললাম। খুব আহা মরি কিছু না!
শুধু পরিশ্রম, কঠোর পরিশ্রম। রাতে আমরা টেলিভিশন দেখতাম- বিশ্বকাপ চলছিল, সুতরাং আমরা
ফুটবল নিয়ে প্রচুর কথা বলতাম।
তারপর আমরা চেরনোবিলের সব বিষয় নিয়ে ভাবা শুরু করলাম- আমার
মনে হয়- ঘটনা ঘটার প্রায় তিন বছর পর। আমাদের পরিচিত একজন ব্যক্তি অসুস্থ হয়ে পড়লেন,
তারপর আর একজন। একজন মারা গেলেন। একজন পাগল হয়ে গেল এবং আত্মহত্যা করলো। তখন আমরা সত্যিকার
অর্থে চেরনোবিল নিয়ে ভাবতে শুরু করলাম। কিন্ত গোটা বিষয়টা আমরা বুঝতে পারব আগামী ২০-৩০
বছর নাগাদ। আমার জন্য আফগানিস্থানে (আমি সেখানে দু’বছর ছিলাম) এবং তারপর চেরনোবিলে
কাটানো সময় (আমি সেখানে তিন মাস ছিলাম) আমার জীবনের স্মরণীয়তম সময়।
আমি বাসায় বাবা-মা’কে বলিনি যে আমি চেরনোবিল গেছিলাম। একদিন
আমার ভাই ইজভেস্তিয়া পড়ার সময় আমার ছবি দেখে অবাক হয়ে গেল আর পেপারটি মা’র কাছে এনে
দেখিয়ে বলতে থাকলো, ‘মা- দ্যাখো, ও একজন খাঁটি বীর!’ আমার মা তখন কাঁদতে শুরু করলেন।
আমরা গাড়ি চালাচ্ছিলাম। আপনি জানেন যে কি দেখলাম? রাস্তার পাশে?
আলোর নিচে- রূপোলী আলোর রেখার নিচে- স্ফটিকের মত কিছু একটা। এইসব...আমরা মোজির হয়ে
কালিঙ্কোভিচের পথে যাচ্ছিলাম। কিছু একটা ঝলমল করছিল। আমরা এটা নিয়ে কথা বলছিলাম- যে
গ্রামে আমরা কাজ করতাম সেখানে আমরা দেখেছি যে গাছের পাতায় ছোট ছোট ছিদ্র। বিশেষ করে
চেরী গাছের পাতায়। আমরা শসা এবং টমোটো কুড়াবো- দেখতে পাব যে শসা ও টমেটো পাতাতেও কালো
ছিদ্র। আমরা শাপশাপান্ত করতে করতে সেই শসা এবং টমেটোই খাব।
আমি চেরনোবিল গেলাম। আমার না গেলেও চলতো। আমি স্বেচ্ছাসেবা
দান করলাম। শুরুতে আমরা কোন নির্লিপ্ত মানুষ দেখিনি। কিন্তÍ পরের দিকে আমরা তাদের চোখে
একধরণের শুণ্যতা দেখতে পেলাম। যখন তারা চেরনোবিলের নানা ক্ষয়-ক্ষতিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিল।
আমি কি কোন মেডেল চেয়েছিলাম রাষ্ট্রের কাছ থেকে? বিশেষ ভাতা বা সুযোগ-সুবিধা? যাচ্ছেতাই
কথা! আমার নিজের জন্য কিছুই চাওয়ার ছিল না। একটি এ্যাপার্টমেন্ট, একটি গাড়ি- আর কি?
হ্যাঁ, আর একটি দাচা বা দেশের বাড়িতে গ্রীষ্মকালীন অবকাশ কাটানোর বাড়ি। আমার ত’ সবকিছুই
ছিল। আসলে চেরনোবিল যেতে আমাদের ভেতরের পৌরুষও আমাদের প্রবৃত্ত করছিলো। অনেক সৈনিকই
এই পৌরুষ বোধ থেকে যাচ্ছিল। এবং প্রত্যেকেই কি? যারা যায় নি তারা ইচ্ছে হলে মেয়েদের
স্কার্টের নিচে লুকোতে পারে। তাদের কারো কারো অন্তসত্ত্বা স্ত্রী ছিল, কারো ছিল ছোট
শিশু আবার তৃতীয় কারো ছিল পুড়ে যাবার ক্ষত। তারা প্রত্যেকেই নিজেরা নিজেদের অভিশাপ
দিচ্ছিল এবং যেভাবেই হোক চলে এসেছিল।
আমরা বাসায় ফিরলাম। চেরনোবিলে পরা সব কাপড়-চোপর আমি খুলে ফেললাম
এবং কাপড়গুলো সব ময়লার ঝুড়িতে ফেলে দিলাম। আমার টুপিটাও দিয়ে দিলাম আমার ছোট ছেলেকে।
সে সত্যিই আমার টুপিটা চাইছিল। টুপিটা পাবার পর ও সেটি সারাক্ষণই পরে থাকত। দুই বছর
পরে আমার ছোট ছেলের মস্তিষ্কে একটি ব্রেইন টিউমার ধরা পড়ল...বাকিটা আপনি নিজেই লিখে
নিন। আমি আর বলতে চাই না।
* * * * * *
আমি তখন মাত্রই আফগানিস্থান থেকে বাড়ি ফিরেছি। আমি একটু বাঁচতে
চাইছিলাম, চাইছিলাম বিয়ে করতে। ঠিক তক্ষুণি বিয়ে করতে চাচ্ছিলাম। এবং তখনি লাল ব্যানারে
এলো সেই আহ্বান, ‘বিশেষ আহ্বান,” এক ঘণ্টার ভেতর নি¤েœাক্ত ঠিকানায় চলে এসো। সাথে সাথে
আমার মা কান্না শুরু করলো। তিনি ভাবলেন আমাকে বোধ করি আবার যুদ্ধে যাবার জন্য ডাকা
হবে।
আমরা কোথায় যাচ্ছি? কোথায়? চারপাশে কোথাও কোন তথ্য নেই।
স্লালৎস্ক স্টেশনে আমরা রেলগাড়ি বদলালাম। কর্তৃপক্ষ আমাদের
কিছু যন্ত্রপাতি দিল এবং তারপর আমাদের বলা হলো খিওনিকি আঞ্চলিক কেন্দ্রে যেতে। আমরা
খিওনিকি গেলাম এবং সেখানেও দায়িত্বে যারা ছিলেন তারা কিছু জানতেন না। তারা আমাদের আরো
ভেতরে নিয়ে গেলেন। একটি গ্রামে যেখানে একটি বিয়ের অনুষ্ঠান হচ্ছিলো। তরুণরা নাচছিলো।
গান, ভদকা। আর দশটি সাধারণ বিয়ের মতোই। এবং আমাদের উপর একটি নির্দেশনামা আছে: এক কুড়ালে
মাটির উপরিভাগ যতটুকু আসে সেটি বর্জন করতে।
৯ই মে, ভি-দিবসে, একজন জেনারেল এলেন। আমাদের সবাইকে সার বেঁধে
দাঁড় করানো হলো, ছুটির দিন উপলক্ষ্যে অভিনন্দন জানানো হলো। আমাদের ভেতর একটি ছেলের
সাহস হলো এবং সে একটি প্রশ্নই করে ফেললো, ‘ওনরা কেন আমাদের তেজষ্ক্রিয়তার মাত্রা বলছেন
না? আমরা কি মাত্রার তেজষ্ক্রিয়তা পাচ্ছি?’ মাত্র ঐ একটি ছেলেই প্রশ্ন করলো। জেনারেল
চলে যাবার পর ব্রিগেডিয়ার তাকে ডাকলেন এবং ধমকে-ধামকে নরক গুলজার করে তুললেন। ‘তুমি
ত’ রীতিমতো উস্কানি দিয়েছো! তুমি ত’ দেখছি রীতিমতো বিপজ্জনক ব্যক্তি।’ কয়েকদিন পর সিনিয়ররা
আমাদের গ্যাস মাস্ক বা গ্যাস এড়ানোর মুখোশ দিলেন আর কয়েকবার ডসিমিটার দেখালেন। তবে
সত্যি সত্যি ডসিমিটার আমাদের হাতে তারা একবারও তুলে দেন নি। প্রতি তিন মাসে কয়েকদিনের
জন্য আমাদের বাড়ি যেতে দেওয়া হতো। তখন আমাদের লক্ষ্য থাকত একটাই: ভদকা কেনা। আমি আমার
পিঠের দু’টো ব্যাগ ভদকার বোতলে বোঝাই করে ফেলতাম। অন্য বন্ধুরা এ কৃতিত্বে আমাকে সাবাশি
দিতে পিঠে তুলে নিত।
বাড়িতে যাবার ঠিক আগে আগে আমাদের কেজিবির কোন বিশিষ্ট ব্যক্তির
সাথে কথা বলতে হতো। তিনি রীতিমতো সম্মোহনকারীর কায়দায় আমাদের বোঝাতেন বা বুঝিয়ে ফেলতে
সক্ষম হতেন যে আমরা যা যা দেখেছি তা’ কারো কাছে, কোথাও এবং কি বিষয়ে ঘটেছে সেসব যেন
ক্ষুণাক্ষরেও বলি নি। আমি যখন আফগানিস্থান থেকে ফিরলাম, আমি জানতাম যে আমি বাঁচব। আর
এখানে যা ঘটলো তা’ ঠিক এর উল্টোটা: বাড়ি ফেরার পরই তোমাকে আমি হত্যা করবো।
আমি কি মনে করছি? আমার স্মৃতিতে কি রয়েছে?
সারাটা দিন আমার গ্রাম থেকে গ্রামে ঘুরে কাটত, তেজষ্ক্রিয়তার
পরিমাপ করতে হত দিনভর। অথচ একজন গ্রাম্য নারীও আমাকে কোনদিন একটি আপেল খেতে দেয়নি।
পুরুষদের অবশ্য ভয় একটু কম ছিল: তারা আমার কাছে এসে আমাকে ভদকা খেতে সাধত কি খানিকটা
শুকরের চর্বি। হলোই বা তেজষ্ক্রিয়তাগ্রস্থ, না হয় খাই একটু। ওদের অনুরোধের মুখে ‘না’
করতে কেমন যেন লাগে। কিন্তÍ সিসিয়াম ঠাসা এসব খাবার চিবনোও ত’ কোন কাজের কথা নয়। কাজেই
আমি ভদকা পান করি। কিন্তÍ অন্য কোন খাবার খাই না।
কিন্তÍ একবার একটা গ্রামে ওরা আমাকে ঠেলে টেবিলে বসালো- খেতে
দিল ঝলসানো ভেড়ার মাংস আর সাথে অন্যান্য নানা পদ। আমন্ত্রণকারী গৃহকর্তা খানিকটা মাতাল
ছিলেন এবং স্বীকার করলেন যে এটি ছিল একটি কচি ভেড়া। ‘আমাকে ত’ ভেড়াটা জবাই করতে হয়েছিলো।
এটার দিকে আর তাকিয়ে থাকতে পারছিলাম না। এটা ছিল কুৎসিততম প্রাণী। আমাকে প্রায় বাধ্য
করছিল যেন এটাকে না খাই।’ আমি: আস্ত এক গ্লাস ভদকা খেলাম খুব দ্রুত। সেটা শোনার পর...
প্রায় দশ বছর আগের ঘটনা। যেন এমন কিছু আগে আর কখনো ঘটেনি এবং
আমি যদি অসুস্থ না হয়ে যেতাম, তবে এতক্ষণে সব ভুলে যেতাম।
তোমাকে ত’ তোমার মাতৃভূমি উদ্ধার করতে হবে! সেবা করা- সেটা
একটি বিশাল কাজ। আমি অনেক কিছু পেয়েছিও: অন্তর্বাস, বুট জুতো, টুপি, প্যান্ট, বেল্ট,
কাপড়ের থলে। এখন যাও! তারা আমাকে স্যাঁতসেঁতে একটি ট্রাকও দিয়েছিল। আমি কংক্রিট আনা-নেওয়া
করতাম। এই এখানে কংক্রিট আছে আবার এই এখানে নেই। আমরা ছিলাম বয়সে তরুণ, অবিবাহিত। আমাদের
সাথে কোন গ্যাস মুখোশ ছিল না। এক ভদ্রলোক ছিলেন- বয়সে আমাদের বড়। তিনি সব সময় মুখোশ
পরতেন। কিন্তÍ আমরা পরতাম না। ট্রাফিক দেখত যারা তারাও পরত না। আমরা থাকতাম ড্রাইভারদের
কেবিনে। কিন্তÍ এই ড্রাইভার বা গাড়িচালকরা আবার দিনে আট ঘণ্টা পারমাণবিক তেজষ্ক্রিয়তাসম্পন্ন
ধূলায় ঘুরতেন। আমাদের প্রত্যেকেই অবশ্য চেরনোবিলে কাজের জন্য ভালই বেতন পেত: স্বাভাবিক
সময়ে এবং স্বাভাবিক পরিবেশে কাজের তুলনায় তিন গুণ বেতন এবং সাথে ছুটিকালীন বেতন। আমরা
টাকাটা ব্যবহার করতাম। আমরা জানতাম যে ভদকা অনেক কিছু ভুলে যেতে সাহায্য করে। এটা আমাদের
চাপ কমায়। কাজেই অবাক হবার কিছু নেই যে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় সৈন্যদের প্রত্যেককে
প্রতিদিন একশো গ্রাম ভদকা পান করতে দেয়া হতো। আর তারপর গোটা গল্পটাই ত’ দেশের মত: মাতাল
সৈন্য কথা বলতে মাতাল গাড়িচালকের সাথে।
যখন এসব বিষয়ে লিখবেন, দয়া করে এসবকে ‘সোভিয়েত বীরত্বের বিষ্ময়’
বলবেন না। এই বিস্ময়গুলো সত্যি সত্যি ছিল। কিন্তÍ প্রথমে তোমার দিক থেকে থাকতে হবে
অদক্ষতা আর কর্তব্যে অবহেলা; শুধুমাত্র তারপরই আপনি ‘সোভিয়েত বীরত্বের বিষ্ময়’ জাতীয়
পদক বা সম্মাননা পাবেন। দুর্গপ্রাচীরের উন্মুক্ত পরিসর আবৃত করে মেশিনগানের সামনে ঝাঁপ
দেওয়া। কিন্তÍ আসলে মেশিনগানের সামনে ঝাঁপ দেবার নির্দেশনামা কোথাও দেওয়া উচিত নয়,
এর কোন প্রয়োজনও নেই, আর কেউ এসব নিয়ে লেখেও না। পারমাণবিক চুল্লীর উপর ছুঁড়ে দেয়া
বালুর কণার মত কর্তৃপক্ষ সেখানে ছড়িয়ে রেখে গেছে। প্রতিদিনই তারা আমাদের একটি নতুন
‘এ্যাকশন আপডেট (কাজের সাম্প্রতিক অবস্থা)’র হালনাগাদ প্রতিবেদন দেবে।
‘পুুরুষেরা নি:স্বার্থভাবে এবং সাহসিকতার সাথে কাজ করছে,’
‘আমরা টিঁকে যাব এবং জয়ী হব।’
তারা আমাকে একটি মেডেল এবং এক হাজার টাকা দিয়েছে।
* * * *
শুরুতে একটি অবিশ্বাস ছিল যে এটি বোধ করি কোন খেলা। কিন্ত আসলে
এটি ছিল একটি সত্যিকারের যুদ্ধ, একটি আণবিক যুদ্ধ। আমাদের কোন ধারণা ছিল না- কি কি
বিষয় বিপজ্জনক আর কি কি বিষয় নয়? কোন্ কোন্ বিষয় আমাদের দেখার দরকার নেই আর কোনটা উপেক্ষা
করাই যাবে না? কেউ জানত না।
এটা ছিল রেল লাইনের ডান দিক বরাবর এক বাস্তবিক বসতি খালি করার
অভিযান। স্টেশনগুলোতে কি ঘটেছিল? আমরা রেলের বগির ভেতর বাচ্চাদের ঠেসে ঢুকিয়ে দিতে
মা-বাবাকে সাহায্য করেছি। এছাড়াও আমরা সৈন্যরা চেষ্টা করতাম এই দূর্যোগের ভেতরেও যেন
সর্বত্র লাইনে শৃঙ্খলা বজায় থাকে। টিকেটের কাউন্টারের জানালার সামনে লাইনে, ফার্মেসীতে
আয়োডিনের জন্য লাইনে। লাইনে দাঁড়ানো মানুষ এ ওকে অভিশাপ দেয় আর মারামারি করে। তারা
বিভিন্ন স্টোর এবং স্ট্যান্ডের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে বিরক্ত হয়ে দরজা ভেঙ্গে ফেলেছে।
তারা জানালার ধাতব গরাদ ভেঙ্গে ফেলেছে।
তার উপর ছিল নানা জায়গার মানুষ। তারা ক্লাব, স্কুল আর কিন্ডারগার্টেনে
বাস করতো। আধা-পেটা খেয়ে তারা ঘুরে বেড়াতো। প্রত্যেকের টাকাই দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছিল।
তারা তাদের নিত্য প্রয়োজনীয় চাহিদার প্রায় সবকিছুই স্টোর থেকে কিনত। আমি কোনদিনই কাপড়
ধুতো যে মহিলা তাকে ভুলব না। কাপড় ধোবার কোন মেশিন ছিল না। কেউ ওয়াশিং মেশিন সেখানে
নিয়ে যাবার কথা ভাবেও নি। কাজেই হাত দিয়েই কাপড় ধুতে হতো। প্রায় সব নারীই ছিলেন বয়ষ্ক।
তাদের হাতে থাকত খোশপাঁচড়া আর গরম জল। এই লন্ড্রি যে শুধু ময়লা ছিল তা’ নয়- এখানে ক্ষতিকর
পারমাণবিক উপাদান রোয়েন্টজেনও অত্যধিক পরিমাণে ছিল।
‘ছেলেরা, একটু কিছু খাও বা খেয়ে নাও।’
‘ছেলেরা, একটু ঘুমাও।’
‘ছেলেরা- তোমরা আজো তরুণ। সাবধানে থাকো।’
এই বৃদ্ধারা আমাদের জন্য মন খারাপ করতো। কাঁদতো।
তারা কি আজো বেঁচে আছেন?
প্রতি বছর ২৬শে এপ্রিল আমরা একত্র হই। মানে আমরা যে সৈনিকেরা
চেরনোবিলে কাজ করেছি তারা। আমরা স্মরণ করি অতীতের সব কিছু। তুমি ছিলে তখন যুদ্ধ পরিস্থিতিতে
মোতায়েন একজন সৈনিকের মত। তোমার তখন খুব দরকার ছিল। আমরা অতীতের মন্দ দিকগুলো ভুলে
যাই আর মনে রাখি শুধু ভাল দিকগুলো। আমরা শুধু মনে করি যে আমরা ছাড়া সরকার পুনর্বাসন
ও পুনর্গঠনের কাজ করতে পারত না। আমাদের ব্যবস্থাপনা, মূলত: একটি সামরিক ব্যবস্থাপনা,
দূর্যোগকালীন সময়ে ভাল কাজ করে। তুমি শেষপর্যন্ত সেখানে মুক্ত এবং এটা জরুরি। স্বাধীণতা! এবং সেই সময়ে রুশরা দেখাবে যে তারা কত মহৎ! কত অতুলনীয়!
আমরা কোনদিনই ডাচ বা জার্মানদের মত হব না। আমাদের কখনোই ঠিকঠাক মতো এ্যাসফল্ট (আলকাতরা)
বা ছিমছাম লন থাকবে না। তবে ইতিহাসের নানা
পর্বের সবটা সময় জুড়েই আমাদের থাকবে প্রচুর বীরপুরুষ।
কর্তৃপক্ষ ডাক পাঠাল এবং আমি গেলাম। আমাকে যেতে হলো! আমি ছিলাম
পার্টির একজন সদস্য। কম্যুনিস্টরা, মার্চ করো! এমনি ছিল গোটা পদ্ধতি। আমি ছিলাম একজন
পুলিশ অফিসার- সিনিয়র লেফটেন্যান্ট। কর্তৃপক্ষ আমাকে ইউনিফর্মের কাঁধে আর একটি ‘তারা’
ঝুলাতে পারব বলে প্রতিশ্রতি দিল। এটা হলো ১৯৮৭ সালের জুন মাসের কথা। কর্তব্য পালনে
যাবার আগে সৈনিকদের শারীরিক পরীক্ষার কথা। আমাকে সেই পরীক্ষা না করেই পাঠানো হলো। অন্য
কেউ একজন ডাক্তারের কাছ থেকে একটি চিরকূট লিখিয়ে নিয়ে এলো যে তার ‘আলসার’ আছে এবং তার
জায়গায় আমাকে যেতে হলো। এটা ছিল জরুরি (হাসি)। ইতোমধ্যে মানুষ নানা ঠাট্টা বানাচ্ছিল।
যেমন, সবাই কাজ থেকে বাড়ি ফেরে আর বউকে বলে, ‘আমাকে উর্দ্ধতনরা বলেছে কাল আমি হয় চেরনোবিল
যাব অথবা ওদের হাতে আমার পার্টির সদস্য কার্ড জমা দিয়ে দেব।’
‘কিন্তু তুমি ত’ পার্টির সদস্য না।’
‘ঠিক তাই। সেজন্যই ত’ ভাবছি কিকরে কাল নাগাদ একটি পার্টির কার্ড
যোগাড় করতে পারি যা জমা দিয়ে দিলে আর চেরনোবিল যেতে হবে না?’
যাহোক, চেরনোবিল ত’ আমরা সৈনিক হিসেবে গেলাম। কিন্তÍ শুরুতে
তারা আমাদের একটি রাজমিস্ত্রী ব্রিগেড হিসেবে সংগঠিত করলো। আমরা একটি ফার্মেসী গড়ে
তুললাম। এরপরই প্রায়ই দূর্বল এবং তন্দ্রাচ্ছন্ন বোধ করতাম সবটা সময়। ডাক্তারকে বলেছি
যে আমি ভাল আছি। শুধুমাত্র গরমের জন্যই এমনটা লাগছে। ক্যাফেটেরিয়াতে যৌথ খামার থেকে
মাংস, দুধ, টক ননী আসত এবং আমরা সেসব খেতাম। ডাক্তার আমাদের কিছুই বলত না। কোন কিছু
খেতে মানা করত না। তারা খাবার বানাবে আর ডাক্তার সবকিছু পরীক্ষা করে তাঁর বইয়ে লিখবেন
যে সব কিছু ঠিক আছে। কিন্তÍ তিনি নিজে কোন খাবারের নমুনা সংগ্রহ করে রাখবেন না। আমরা
সে বিষয়গুলো খেয়াল করেছি। এভাবেই চলছিলো। আমরা মাঝে মাঝে অধৈর্য্য হয়ে যেতাম। এদিকে
বাগানে গাছে গাছে স্ট্রবেরী ফুল ফুটছিল, চারদিকে মধু।
লুটপাটকারীরা এর ভেতরেই চেরনোবিলে পৌঁছে গেছিল। আমরা জানালা
এবং দরজা তুলে দিলাম। তবু স্টোর দোকানগুলো সব লুট হলো, জানালার ধাতব পাতগুলো ভাঙ্গা
হলো, মেঝেতে ময়দা আর চিনি, চকোলেট। সবজায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ভাঙ্গা ক্যান। একটি গ্রামের
অধিবাসীরা গ্রাম খালি করলো অথচ সেই গ্রাম থেকে পাঁচ কি দশ কিলোমিটার দূরের গ্রামটি
কিন্ত খালি করা হলো না। লুণ্ঠনকারীরা লুণ্ঠিত গ্রামটি থেকে নানা দ্রব্য-সামগ্রী লুট
করে নিয়ে এলো। এভাবেই হয়েছে সব কিছু। আমরা ত’ জায়গাটা পাহারা দিচ্ছি। হঠাৎই হয়তো যৌথ
খামারের প্রাক্তন প্রধান কিছু স্থানীয় মানুষ নিয়ে চলে এলেন। এই স্থানীয় মানুষেরা ইতোমধ্যে
এখানে পুনর্বাসিত হয়েছেন, তবে তারা পুনরায় এখানে এসেছেন তাদের ইতোমধ্যে ফলানো ফসল সংগ্রহ
করতে এবং বীজ বুনতে। তারা আঁটি আঁটি খড় বের করে আনত। সেই সব খড়ের আঁটির ভেতর আমরা বীজ
বুনবার যন্ত্র এবং মটর সাইকেলও দেখেছি। সেখানে একটি দ্রব্য বিনিময় প্রথা ছিল- গ্রামের
মানুষ তোমাকে ঘরে বানানো ভদকা দেবে, তুমি তাদেরকে টেলিভিশন আনা-নেওয়া করার অনুমতি দাও।
এখন আমরা বীজ বোনার যন্ত্র এবং ট্রাক্টরের ব্যবসা করছি। বদলে এক বোতল বা দশ বোতল ভদকা
উপঢৌকন। টাকায় আমাদের উৎসাহ ছিল না। (হাসি) এ ছিল খানিকটা সাম্যবাদের মতই। সেখানে সবকিছুর
জন্য ছিল কর বা শুল্কের ব্যবস্থা: একটি গ্যাসের ক্যানেস্তারা- আধা লিটার ভদকা: আস্ত্রাখানের
একটি ফার কোট- দুই লিটার; মোটর সাইকেল-এসবকিছুই আবার দিব্যি বদল হতো। আমি সেখানে ছয়
মাস ছিলাম, সেটাই ছিল আমার এ্যাসাইনমেন্ট। তারপর আমার বদলে অন্য একজন এলো। আসলে আমরা
খানিকটা সময় বেশিই ছিলাম সেখানে। কারণ বাল্টিক রাষ্ট্রগুলো থেকে সৈন্যরা আসতে চায় নি।
এমনি ছিল গোটা বিষয়টি। তবে আমি জানি কিভাবে এই সব জনপদের অধিবাসীরা চলে যাবার পর কিছু
চোর-ডাকাত-অপরাধপ্রবণ মানুষ এই গোটা এলাকা লুট করেছে, যা যা কিছু নিয়ে যেতে পারত সেসব
কিছুই উত্তোলন এবং বহন করতে পেরেছে। তারা গোটা এলাকাকেই যেন তার যাবতীয় চারিত্র্য সমেত
ফিরিয়ে আনতে পেরেছে। সেই চারিত্র্য খুঁজে পাওয়া যাবে বাজারে, বন্ধকী দোকানে আর দাচায়।
কাঁটাতারের ওপারে যা ছিল সেই মৃত্তিকা রয়ে গেল পড়ে। এবং অনেক কবর। এবং আমাদের স্বাস্থ্য।
আমাদের বিশ্বাস। অথবা আমার বিশ্বাস।
* * * * *
আমরা সে এলাকায় গেলাম। আমাদের সব যন্ত্রপাতি নিলাম। ‘¯্রফে
একটা দূর্ঘটনা মাত্র,’ ক্যাপ্টেন আমাদের বললেন, ‘দূর্ঘটনাটা বহুদিন আগে ঘটেছে। তিন
মাস আগে। এটা আর বিপজ্জনক নয়।’ ‘বেশ,’ সার্জেন্ট বললেন, ‘খাবার খাওয়ার আগে শুধু তোমার
হাত ধুয়ে নাও।’
আমি তেজষ্ক্রিয়তার স্তর পরিমাপ করলাম। যেই না যন্ত্রটি কালো
দেখায় যা দিয়ে বোঝায় যে আমাদের দেহে তেজষ্ক্রিয়তা আছে, তখনি এই কর্তৃপক্ষের মানুষজন
আমাদের একটি ছোট্ট গাড়ির স্টেশনে নিয়ে যায় এবং নানা কিছু দেওয়া শুরু করে: টাকা, সিগারেট,
ভদকা। আমাদের শুধুমাত্র এই বাজেয়াপ্তকৃত অবস্থার সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে দাও। ওরা
সবাই ওদের ব্যাগ ভরবে। ব্যাগগুলো ওরা নিয়ে যাবে কোথায়? সম্ভবত: কিয়েভ অথবা মিনস্কে,
কোন সেকেন্ড-হ্যান্ড দ্রব্যের বাজারে। তারা যেসব জিনিষ ফেলে যেত, আমরা সেসবেরই যতœ
নিতাম। জামাকাপড়, বুট জুতো, চেয়ার, হার্মোনিকা, বীজ বপন করবার যন্ত্র প্রভৃতি। আমরা
এগেুলো নদর্মায় কবর দিয়েছি- আমরা এসব কবরকে বলতাম ‘সাম্প্রদায়িক কবর।’
আমি বাড়ি ফিরি। আমি নাচতে যাব। একটি মেয়েকে একদিন পছন্দ হবে
আমার নাচের আসরে যাকে আমি বলবো: ‘চলো- আমরা পরষ্পরের সাথে পরিচিত হই।’
‘কিসের জন্য? তুমি একখন একজন চেরনোবিলাইট। আমি তোমার সন্তান
গর্ভে ধারণ করার কথাও ভাবতে ভয় পাই। তোমার বাচ্চা ধারণ করতে আমার ভয় করবে।’
* * * *
আমার রয়েছে নিজস্ব স্মৃতিসমূহ। চেরনোবিলে যতদিন সেনাবাহিনীর
অফিসার হিসেবে দায়িত্ব করেছি, আমার কাজ ছিল মূলত: গার্ড ইউনিটের কমান্ডার হিসেবে কাজ
করা। অনেকটা প্রলয়কালের পরিচালক হবার মত (হাসি)। হ্যাঁ। লেখো যে ঠিক প্রলয়কালের মত।
আমার মনে পড়ে যে প্রিপিয়াত শহর থেকে আমি একটি ট্রাক নিয়ে আসছিলাম।
গোটা শহর ইতোমধ্যে খালি হয়ে গেছে, কোথাও কোন জন-মানুষ নেই।
‘দয়া করে নথি-পত্র দেখান।’
অনেক মানুষের কাছেই যথোপযুক্ত নথি-পত্র নেই। পেছন দিকটায় একটি
নরম ক্যানভাসের প্রচ্ছদ। আমরা এটাকে দেখতে দেখতে বড় করে তুলি একং আজো পরিষ্কার ভাবে
সব কিছু মনে করতে পারি: ২০টা চায়ের সরঞ্জাম, একটি বড় ড্রেসার, একটি আর্ম চেয়ার, একটি
টেলিভিশন, ছোট গালিচা, বাইসাইকেল।
সুতরাং আমি একটি চুক্তির খসড়া লিখি।
আমার মনে পড়ে জনশুণ্য সব গ্রামগুলো যেখানে শুকরেরা সব পাগল
হয়ে গেছে এবং দৌড়ে বেড়াচ্ছে। যৌথ খামার অফিস এবং ক্লাব ঘর, এই বিবর্ণ পোস্টারগুলো:
‘আমরা মাতৃভূমিকে রুটি দেব!’
‘সোভিয়েত মেহনতি মানুষের জয়!’
‘মেহনতি মানুষের অর্জন চিরঞ্জিব।’
আমার মনে পড়ে অযতেœ থাকা গণকবরগুলোর কথা- ভাঙ্গা একটি সমাধি
প্রস্তরে কিছু মানুষের নাম: ক্যাপ্টেন বরোকিন, সিনিয়র লেফটেন্যান্ট...আর তারপর সেই
দীর্ঘ যত নামফলক- অনেকটা কবিতার মত- ব্যক্তিগত যত নাম। আর তার চারপাশেই বুরডক ফুলের
ঝোপ, কাঁটা গাছ কি হাঁসের পা।
আমি এই খুব চমৎকার ভাবে সাজানো বাগানটার কথাও মনে করি ।এর মালিক
বাড়ির ভেতর থেকে এসে আমাদের দেখবেন।
‘ছেলেরা- তোমরা চেঁচামেচি করো না। ইতোমধ্যে এখানে আমরা উর্দি
পরে যোগদান করে ফেলেছি। আমরা বসন্ত নাগাদ ফিরে যাব।’
‘তাহলে তোমরা বাগানের মাটি তুলে ফেলছ কেন?’
‘এটা শুধু এবারের শরৎকালের জন্য।’
‘আমি বুঝতে পারি, কিন্তÍ আমাকে একটি খসড়া চুক্তি লিখতে হবে।’...
আমার স্ত্রী বাচ্চাকে নিয়ে চলে গেল। ঐ কুত্তীটা! তাই বলে আমি
নিজেকে ভানিয়া কাতভের মত ফাঁসিতে ঝুলাতে যাচ্ছি না। কিম্বা সাত তলার জানালা থেকে নিজেকে
নিচে ফেলে দিতেও আমি যাচ্ছি না। ঐ কুত্তীটা! আমি যখন চেরনোবিল থেকে এক স্যুটকেস টাকা
নিয়ে ফিরলাম তখন তার কাছে সব খুব ঠিক, সব খুব ভাল। আমরা একটি গাড়ি কিনলাম। ঐ কুত্তীটা
আমার সাথে ভালই ছিল। তার কোন ভয় ছিল না (সাক্ষাৎকারদাতা এই পর্যায়ে গান গাওয়া শুরু
করে)।
এক সহ¯্র গামা রশ্মিও
রুশ মোরগকে ঠেকাতে পারে না তার সুন্দর দিন পাওয়া থেকে।
সুন্দর গান। সেখান থেকে। কোন কৌতুক শুনতে চান? সৈনিকেরা ত’
পারমাণবিক চুল্লীর কাছ থেকে ফেরে। তাদের বউরা তখন ডাক্তারকে জিজ্ঞাসা করে, ‘আমার এখন
ওর সাথে কি করা উচিত?’ ডাক্তার বলে, ‘ওকে ¯œান করাও, জড়িয়ে ধরো- তবে তাকে স্বামী হিসেবে
প্রাপ্য কমিশন দিও না।’ ঐ কুত্তীটা! ও আমাকে ভয় পাওয়া শুরু করলো আমার শরীরের তেজষ্ক্রিয়তার
জন্য। বাচ্চাটাকে নিয়ে চলে গেলো। (হঠাৎই গম্ভীর হয়ে যায়)। সৈন্যরা ত’ রিএ্যাক্টরের
একদম কাছে ঘেঁষে কাজ করেছে। আমি সৈন্যদের তাদের ডিউটি শিফটে পৌঁছে দিতে গাড়ি চালিয়ে
রিএ্যাক্টরের কাছে যেতাম এবং ফিরতাম। অন্য সবার মতই আমার ঘাড়েও একটি গোটা তেজষ্ক্রিয়তা
মাপনী মিটার লটকে থাকত। ওদের শিফটের কাজ শেষ হয়ে গেলে আমরা চলে যাব প্রথম বিভাগে- একটি
শ্রেণীবদ্ধ বিভাগে। সেখানে তারা আমাদের পড়া ধরবে, আমাদের প্রত্যেকের কার্ডে কিছু লিখে
দেবে। তবে আমাদের প্রত্যেকের দেহে কতটা মাত্রায় রোয়েন্টজেন আছে তা’ কিছুতেই বলবে না।
সেটা সবসময়ই ছিল একটি সামরিক ভাবে গোপনীয় তথ্য। ঘেন্না করি ওদের! কিছুদিন পর পর হঠাৎ
বলবে. ‘থামো। তুমি আর এটা নিতে পারবে না।’ এটুকু মাত্র চিকিৎসা বিষয়ক তথ্য আমরা তাদের
কাছ থেকে পেতাম। এমনকি যখন চেরনোবিল ছেড়ে চলে আসছি তখনো তারা বলেনি যে আমার দেহে কত
মাত্রায় রোয়েন্টজেন আছে। এখন তারা ক্ষমতার জন্য লড়াই করছে। মন্ত্রীত্বের পদের জন্য।
ওদের নির্বাচন আছে। আর একটি কৌতুক শুনবেন? চেরনোবিলের ঘটনার পরেও আপনার যা খুশি আপনি
খেতে পারেন তবে হাগু করতে হবে সীসায়।
ডাক্তাররা কিভাবে আমাদের সাথে কাজ করতে যাচ্ছে? আমরা আমাদের
সাথে কোন নথি-পত্র আনিনি। তারা এখনো সেগুলো লুকিয়ে রাখছে। অথবা তারা নথিগুলো পুড়িয়ে
ফেলেছে কারণ সেগুলো তখনো পর্যন্ত এতটাই গোপনীয় ছিল। আমরা কিভাবে ডাক্তারদের সাহায্য
করতে পারি? যদি আমার একটি সার্টিফিকেট থাকত যেখানে আমার শরীরে তেজষ্ক্রিয়তার মাত্রা
ঠিকঠাক বসানো থাকত? আমি সেটা আমার কুত্তীকে দেখাতাম। আমি তাকে বলতাম যে আমি যে কোন
কিছু হজম করতে পারতাম এবং বিয়ে করে, বাচ্চা নিতে পারতাম। চেরনোবিলের লিকুইডেটরের ভাষায়,
‘হে ঈশ্বর, যেহেতু এটা তুমিই তৈরি করেছো যা আমি করতে পারি না, তবে এটা কি তুমি আবার
বানাবে যা আমি করতে চাচ্ছি না?’ যাও, সব্বাই সরে যাও আমার চোখের সামনে থেকে!
ওরা আমাদের একটি গোপনীয়তা ভঙ্গ না করার ফর্মে সই করালো। কাজেই চেরনোবিল থেকে ফেরার পর আমি কাউকে কিছু বলিনি।
সেনাবাহিনীর সদস্যরা সব থেকে বেশি তেজষ্ক্রিয়তার মাত্রা গ্রহণ করেছে এবং আক্রান্ত হয়েছে।
আমি হলাম দ্বিতীয় সারির পঙ্গু। মাত্র বাইশ বছর বয়স আমার তখন। আমার শরীরে ভাল মাত্রার
তেজষ্ক্রিয়তা ঢুকেছিল। বিষ্ফোরিত রিএ্যাক্টর বা পারমাণবিক চুল্লী থেকে বালতি বালতি
কালো পেন্সিল সীসা আমরা তুলেছি। এই কালো পেন্সিল সীসার তেজষ্ক্রিয়তার মাত্রা ছিল দশ
হাজার রোয়েন্টজেন। খুব সাধারণ শাবল দিয়ে আমরা এই পেন্সিল সীসার স্তÍপ খুঁড়ে তুলতাম,
এক শিফটের কাজ করতে গিয়ে প্রায় ত্রিশ বার মাস্ক বদলাতাম- মানুষ এই মাস্ককে বলতো ‘ঘোণা।’
যেন পেন্সিল সীসা না- বিষ্ফোরিত রিএ্যাক্টর থেকে বালতি বালতি করে কবরে নামিয়ে দিচ্ছি
কফিনের পাথর। রিএ্যাক্টরটি একা মানুষের জন্য যথেষ্ট বড়সর একটা কবর বিশেষই ছিল। বিষ্ফোরণের
পরেই এর ধ্বংসস্তÍপের নিচে শুরুর কয়েক মিনিটের ভেতর যাকে পাওয়া যায় তিনি হলেন রিএ্যাক্টরটির
সিনিয়র অপারেটর ভালেরি খোদেমচুক। তিনি বিষ্ফোরণের ধ্বংসস্তপের ভেতর আটকা পড়েছিলেন।
এটা বিশ শতকের একটি পিরামিড আসলে যেখানে সব মমিদের শবাধার। তখনো আমাদের হাতে তিন মাস
বাকি ছিল। আমাদের ইউনিট ফিরলো। তারা আমাদের কাপড় বদলানোরও সুযোগ দেয় নি। একই প্যান্ট
আর বুট জুতো পরে আমরা টহল দিতে থাকলাম। যতদিন না তারা আমাদের চাকরি থেকে ছাড়িয়ে দিয়েছে।
আর তারা যদি আমাকে কথা বলতে দিত, তবে কার সাথে আমি কথা বলতাম?
চেরনোবিল যাবার আগে আমি ত’ কাজ করতাম একটি কারখানায়। চেরনোবিল থেকে ফিরে কাজে যোগ দেবার
পর প্রায়ই শরীর খারাপ করতো। তখন আমার উর্দ্ধতন কর্মকর্তা আমাকে বলতেন: ‘অসুস্থ হওয়াটা
বন্ধ করো আর নয়তো আমরাই তোমাকে ছাড়িয়ে দেব।’ তারা সত্যি আমাকে কাজ থেকে ছাড়ালো। আমি
তখন খোদ পরিচালকের কাছে গিয়ে বললাম, ‘আপনার এটা করার কোন অধিকার নেই। আমি একজন চেরনোবিলাইট।
আমি আপনাকে বাঁচিয়েছি। রক্ষা করেছি।’ তিনি বললেন: ‘আমরা ত’ তোমাকে সেখানে পাঠাই নি।
সরকারের ডাকে তুমি গেছ।’
এক রাতে ঘুম থেকে জেগে দেখি মা আমাকে বলছে, ‘সোনি, তুমি কেন
কোন কথা বলছো না? তুমি ত’ ঘুমিয়ে যাও নি। তোমার চোখ ত’ খোলাই আছে। চোখ খোলা রেখে তুমি
শুয়ে আছো। আর তোমার রুমের আলোও জ্বলছে।’ আমি কোন কথা বললাম না। কেউই আমার সাথে ঠিক
তেমন ভাবে কথা বলতে পারে না যেমন ভাবে বললে আমি সত্যিকারের অভিজ্ঞতাগুলো সব খুলে বলতে
পারি। আমার নিজের মত করে। কেউ বোঝে না যে আমি ঠিক কোন্ জায়গা থেকে আবার ঘরে ফিরে এসেছি।
আমিও কাউকে বলতে পারি না।
মৃত্যুর ভয় আর করি না। অথবা খোদ মৃত্যুকেই কোন ভয় হয় না আমার।
তবে আমি ঠিক জানি না যে কিভাবে মরতে যাচ্ছি। আমার বন্ধু মরেছে। ও মোটা হয়ে গেছিল। ঠিক
যেন আস্ত একটি পিপের মত চওড়া। আর আমার পড়শি- সে-ও চেরনোবিল গেছিল কাজ করতে। সে একটি
ক্রেন চালাতো। ও কয়লার মত কালো হয়ে ফিরেছিল। আর এত শুকিয়ে গেছিলো যে শেষে বাচ্চাদের
সাইজের কাপড় পরতে হতো। আমি জানি না ঠিক কিভাবে মরতে যাচ্ছি আমি। শুধু এটুকু জানি যে
আমার ডায়াগনোসিস হতে হতেই আর বেশি দিন থাকব না আমি এই পৃথিবীতে। তবে আমি মৃত্যুর গোটা
প্রক্রিয়াটি অনুভব করতে চাই- মানে যখন মরব আর কি তখন! ঠিক যেন মাথায় গুলি বেঁধার মত।
আমি ত’ আফগানিস্থানেও ছিলাম। সেখানে বরং সব কিছু আরো সহজ ছিল। তারা তোমাকে গুলি করে
ফ্যালে এই যা।
সংবাদপত্র থেকে একটি প্রবন্ধ আলাদা করে রেখেছিলাম। এটা চেরনোবিলের
রিএ্যাক্টরের অন্যতম অপারেটর লিওনিদ তপতুনোভকে নিয়ে। সেই রাতে তিনি পারমাণবিক স্টেশনে
ডিউটিতে ছিলেন এবং বিষ্ফোরণের কয়েক মিনিট আগে আন্দাজ করতে পেরে তিনি সতর্ক করার জন্য
‘দূর্ঘটনা’ লেখা লাল বোতামটি টিপেছিলেন। কিন্ত এটা কাজ করেনি। দূর্ঘটনার পর সবাই তাকে
মস্কোতে হাসপাতালে নিয়ে গেল। ডাক্তাররা বললেন, ‘ওনাকে সুস্থ করতে আমাদের দরকার হবে
আসলে একটি গোটা, নতুন মানব শরীর।’ তাঁর গোটা দেহে- পিঠের উপরে মাত্র একটি ছোট অ-রেডিওএ্যাক্টিভ
দাগ ছিল। বাকিটা পুরোটাই তেজষ্ক্রিয়ায়িত শরীর। মস্কোর মিতিনস্কায়া কবরস্থানে তাঁকে
কবর দেয়া হলো। যেমন তারা অন্যদের দিয়েছে। গোটা
কফিনটা তারা তবকে মুড়িয়েছে। তার উপর তারা আধা মিটার কংক্রিটের টুকরো ঢাললো। তারও উপর
দিল একটি সীসার পুরু ঢাকনা। ওর বাবা এলো। ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাঁদছিলেন। মানুষজন
সব পাশ থেকে হেঁটে চলে যাচ্ছে আর বলছে: ‘তোর বেজন্মা ছেলেই ছিল চেরনোবিলের অপারেটর।
সে-ই চুল্লী উড়িয়ে এই দূর্ঘটনা ঘটালো।’
আমরা একাকী। আমরা এখানে আগন্তক। তারা আমাদের কবরও দেয় আলাদা
আলাদা ভাবে। অন্যদের যেভাবে কবর দেয় সেভাবে দেয় না। যেন আমরা গ্রহান্তরের মানুষ। এর
চেয়ে আমার আফগানিস্থানে মরলেও ভাল ছিল। সত্যি আমার আজকাল তেমনটা মনে হয়। আফগানিস্থানে
মৃত্যু ছিল একটি স্বাভাবিক বিষয়। এসব বিষয় বুঝতে খুব সমস্যা ত’ হবার কথা নয়।
* * * * * * * *
উপর থেকে, হেলিকপ্টারে বসে, আমি যখন চেরনোবিলের রি-এ্যাক্টরের
দিকে উড়ছিলাম, আমি দেখতে পেয়েছি ইউরোপীয় ক্ষুর হরিণ আর বুনো শুকর। ওদের রোগা আর ঝিমুনি
ধরা মনে হচ্ছিলো। যেন বা সব খুব ধীর গতিতে নড়ছে। ওরা ত’ চেরনোবিলের আশপাশের তৃণভূমির
ঘাসই খাচ্ছিলো। অবলা জীবগুলো ত’ বুঝছিল না যে এই ঘাস তেজষ্ক্রিয়তা বর্জ্য মিশানো আর
ওদের এক্ষুণি চেরনোবিলের আশপাশের বনাঞ্চল আর তৃণভূমি ছেড়ে চলে যাওয়া উচিত। এ জায়গা
ছেড়ে চলে যেতে থাকা মানুষের ঢলের সাথে ওদেরও চলে যাওয়া উচিত।
আমার কি চেরনোবিলে যাওয়া উচিত অথবা উচিত নয়? আমার কি ওড়া উচিত
অথবা উচিত নয়? আমি ত’ একজন কমিউনিস্ট ছিলাম- দূর্গত এলাকায় না গিয়ে কিভাবেই বা পারতাম?
দু’জন প্যারাট্রুপার প্রত্যাখ্যান করলেন- তাঁদের ঘরে নব পরিণীতা
স্ত্রী, তাদের তখনো কোন সন্তান হয়নি। কিন্তÍ চেরনোবিলে যেতে রাজি না হওয়ায় তাঁদের শাস্তি
দেয়া হলো। তাদের কর্মজীবনের সেখানেই পরিসমাপ্তি ঘটলো। এছাড়া সমাজের চোখে পৌরুষের সংজ্ঞার
যে আদালত, সম্মানবোধের আদালতেও তাঁদের অবমাননা ত’ হলোই। কিন্তÍ এই যে দু’জন প্যারাট্রুপার
যেতে রাজি হলেন না, এটাই যেন আমাকে চেরনোবিল যেতে প্ররোচিত করলো- ওরা যায় নি, আমি ত’
তবে যাবই। এখন আমি পেছনের কথা ভাবলে গোটা বিষয়টিই ভিন্ন ভাবে ভাবি। চেরনোবিল থেকে ফিরে
আসার পর নয়টি অপারেশন এবং দু’টো হার্ট এ্যাটাকের পর আমি সেই চেরনোবিল যেতে রাজি না
হওয়া দু’জনকে আর বিচার করি না- এখন ওদের দ্বিধা আর দূর্বলতার জায়গাকে আমি বুঝি। ওরা
ছিল বয়সে তরুণ। কিন্তÍ আমাকে ত’ যেতেই হতো। সেটা নিশ্চিত ছিল। একজন পারে নি, কাজেই
আমাকে যেতেই হবে দূর্গত এলাকায়। সেটাই পৌরুষ।
হেলিকপ্টারে বসে আকাশ থেকে সব কিছু দেখতে দেখতে যেটা সবচেয়ে
অবাক লাগে তা’ হলো বিধ্বস্ত চেরনোবিল জুড়ে ধাতব সা¤্রাজ্যের জয় জয়কার: ভারি হেলিকপ্টার,
মাঝারি মানের হেলিকপ্টার, মিগ-২৪ এবং একটি যোদ্ধা হেলিকপ্টার। চেরনোবিলে মিগ-২৪ দিয়ে
কি হবে? কিম্বা মি-২-এর মত কোন যুদ্ধ বিমান দিয়েই বা কি করা হবে? এই সব যুদ্ধ বিমান
বা হেলিকপ্টারের পাইলটরা অধিকাংশই বয়সে তরুণ। মাত্রই সবাই আফগানিস্থান থেকে ফিরেছে।
ওদের অনুভূতিটা ছিল এমন যে মাত্রই ত’ আফগানিস্থানে যথেষ্ট ধকল সেরে তারা ফিরেছে। সেখানে
বিস্তর লড়াই করেছে তারা। বিয়েলোরুশিয়ার অরণ্যের ভেতর চেরনোবিলের রি-এ্যাক্টরের অনতিদূরে
তারা বসে আছে আর ক্ষুর হরিণ ধরছে সময় কাটাতে। সেটাই ছিল তাদের উপর উর্দ্ধতনদের নির্দেশ।
কেন এত তাজা প্রাণকে চেরনোবিল পাঠাতেই হলো? তেজষ্ক্রিয়তা গ্রহণ করতে? কেন? কিছু বিজ্ঞানী
বা বিশেষজ্ঞ হলেই ত’ চলতো এ দূর্ঘটনার প্রতিকার করতে। এত মানুষ ত’ দরকার ছিল না। যাহোক,
হেলিকপ্টারে বসে উপর থেকে আমি দেখলাম একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত দালান, চারপাশে ধ্বংসযজ্ঞের
স্তÍপ,- আর সেই স্তপে উপর থেকে দেখা অনেক ক্ষুদ্রাকৃতি মানুষের সারি। পূর্ব জার্মানী
থেকে একটি ক্রেন আনা হয়েছিল- যেটা কাজ করে না। রি-এ্যাক্টরের কাছে যেতেই এটি ধসে পড়ে।
রোবটগুলো অকেজো হয়ে পড়লো। একাডেমিক লুকাচেভের নক্সা করা সেই রোবটগুলো যা মঙ্গলগ্রহে
অভিযানের কাজে ব্যবহৃত হবে বলে বানানো হয়েছিল। আর জাপানী রোবটগুলো- তাদের সব তার তেজষ্ক্রিয়তায়
ধ্বংস হয়ে গেল। অন্তত: বাহ্যিকভাবে তেমনটাই। কিন্ত মনুষ্য দেহধারী সৈনিকেরা তাদের রাবারের
স্যুট আর দস্তানা পরে সেখানে রয়ে গেল...
চেরনোবিলে কাজ শেষে বাড়ি ফেরার আগে আমাদের বলা হলো যে আমাদের
এখানে আসতে হয়েছিল রাষ্ট্রের স্বার্থে। পরে আমাদের মানুষকে জনে জনে বলা ঠিক হবে না
যে এখানে আমরা ঠিক কি দেখেছি। সত্যি বলতে আমরা ছাড়া কেউ জানতও না যে এখানে কি কি ঘটেছে।
সব কিছু আমরাও যে বুঝেছি তা’ নয়। তবে আমরা সব কিছু ত’ অন্তত: দেখেছি।
তেজষ্ক্রিয়তা দেখতে কেমন সে বিষয়ে একাকী সংলাপ
প্রথম আমি যে বিষয়টা নিয়ে ভয় পাই তা’ হলো- এক সকালে বাগানে
আর উঠোনে দেখলাম কিছু যেন শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মরে থাকা ছুঁচোর সারি। কারা ওদের গলা টিপে
মেরেছে? সাধারণত: ছুঁচোরা ত’ মাটির নিচে থেকে উপরে উঠে আসেও না। কিছু একটা তাদের নিশ্চিত
তাড়া করেছে। আমি ক্রুশের দিব্যি দিয়ে বলছি!
আমার ছেলে গোমেল (দক্ষিণ-পূর্ব বেলারুশের একটি শিল্প শহর) থেকে
ফোন দিল: ‘মে মাসের ছারপোকাগুলো কি বের হওয়া শুরু হয়েছে?’
‘কোন ছারপোকাই নেই। এমনকি কোন শূককীটও দেখছি না। সব যেন পালিয়ে
আছে!’
‘পোকাদের কি খবর?’
‘বৃষ্টিতে একটি পোকা যদি খুঁজে পেতি, তবে তোর মুরগীও খুশি হতো।
কিন্তÍ কোন পোকাও ত’ দেখছি না।’
‘এটাই প্রথম লক্ষণ মা। মে মাসের কোন ছারপোকা বা পোকা যদি ঋতুকালীন
দেখা না দেয়, তবে বুঝতেই হবে যে চারপাশে কড়া তেজষ্ক্রিয়তা।’
‘তেজষ্ক্রিয়তা আবার কি জিনিষ?’
‘মা, তেজষ্ক্রিয়তা হলো মৃত্যুর আর এক নাম। দিদিমাকে বলো যে
তোমার এখন জায়গা ছাড়ার সময় হয়েছে। তুমি আমাদের এখানে এসে থাকো।’
‘কিন্ত আমরা ত’ এখনো বাগানে গাছ-পালাই সব লাগিয়ে পারি নি।’
আহা, সবাই যদি বুদ্ধিমান হয়, তবে বোকা সোকা কারা থাকবে শুনি?
তুমি আগুনে পড়েছো ত’ আগুনে পড়েছো। যদি আগুনটি সাময়িক হয় তবে কেউ এটা নিয়ে তত ভয় করে
না। কিন্তÍ অণু পরমাণু বিষয়ে আমাদের ভেতর কে-ই বা কি জানত? আবারও ক্রুশের দিব্যি দিয়ে
বলি! আর আমরা কিনা সেই পারমাণবিক প্ল্যান্টের পাশেই বাস করতাম? পাখি ওড়ার দূরত্বে ত্রিশ
কিলোমিটার আর রাজপথের হিসেবে ধরলে ৪০ কিলোমিটার। আমরা সুখী ও সন্তষ্ট ছিলাম। চেরনোবিল
ত’ বড় শহর। একটি টিকেট কেটে সেখানে গেলেই হলো- ঐ শহরে সবকিছু পাওয়া যায়। মস্কোর মতই।
সস্তায় সালামি খেতে পাওয়া যায়, দোকানে পর্যাপ্ত মাংস রয়েছে। যা তুমি কিনতে চাও। সে
ছিল সত্যি বড় সুন্দর সময়!
মাঝে মাঝে আমি রেডিওর নব ঘোরাই। তেজষ্ক্রিয়তার নানা খবরে রেডিও
আমাদের ভীত করেই চলে। কিন্তÍ এখানে আমাদের জীবন কিন্তÍ তেজষ্ক্রিয়তার পর বরং আরো যেন
ভাল হলো। দিব্যি! চারদিকে তাকিয়ে দ্যাখো: ওরা কমলালেবু এনেছে, তিন পদের সালামি, যা
তুমি চাও। আর গ্রামে যাও! আমার নাতি-নাতনীরা
ত’ গোটা পৃথিবীতেই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। সবচেয়ে ছোটটা মাত্র ফ্রান্স থেকে এলো, যেখান থেকে
নেপোলিয়ন এসে আমাদের আক্রমণ করেছিল- ‘দিদা, আমি একটি আনারস দেখেছি!’ আমার ভাইপো, তার
ভাই, সবাই মিলে নাতিকে আমার বার্লিনে নিয়ে গেল ডাক্তার দেখাতে। ঐ যেখানে হিটলার ট্যাঙ্কের
উপর চড়ে যুদ্ধ শুরু করেলা। এটা একটা নয়া পৃথিবী। সবকিছুই বড় আলাদা। ঐ তেজষ্ক্রিয়তা
কি সেসবের জন্য দায়ি, নাকি অন্য কিছু?
তেজষ্ক্রিয়তা বস্তটি আসলে কি? হতে পারে সিনেমায় তারা এই বিষয়ে
দেখায়? তোমরা কি সিনেমায় এ বিষয়ে কিছু দেখেছো? এটা কি সাদা দেখতে, না কেমন? কেউ কেউ
বলে তেজষ্ক্রিয়তার কোন রং নেই এবং কোন গন্ধও নাকি নেই। আবার কেউ কেউ বলে এটা নাকি কালো
রঙের। মাটির মত। কিন্তÍ এটা যদি বর্ণহীন হয়ে থাকে, তবে সেটা ঈশ্বরের মতই হবে। ঈশ্বর
সর্বত্র বিরাজ করেন, তবে তুমি তাঁকে দেখতে পারো না। মানুষেরা ত’ তেজষ্ক্রিয়তার কথা
বলে আমাদের শুধু ভয় দেখায়। অথচ, বাগানে দ্যাখো দিব্যি আপেল ঝুলছে, গাছে গাছে দোলে নতুন
পাতা, ক্ষেতের ভেতর পাবে আলু। আমার বোন ওর স্বামীর সাথে চলে গেল তাদের বাড়িতে। এখান
থেকে বিশ কিলোমিটার দূরে। সেখানে দু’মাস ছিল তারা। এর ভেতর একদিন এক পড়শি দৌড়ে এলো
ওর কাছে, ‘আপনার গরু ত’ আমার গরুকে তেজষ্ক্রিয়তা পাঠিয়েছে! গাভিটি আমার পড়ে যাচ্ছে।’
‘বাহ্ রে, আমার গরু কিভাবে তাকে তেজষ্ক্রিয়তা পাঠাবে?’
‘বাতাসের ভেতর দিয়ে যেভাবে যায় সেভাবে। ধূলার মত। এটা ওড়ে।’
হুম্- যত রূপকথা! গল্পের পর গল্প।
কিন্তÍ এখানে যা যা ঘটেছিল তা-ও বলি তোমাদের। আমার দাদু মৌমাছি
পালতেন। তাঁর ছিল পাঁচটি মৌচাক। তারা গত দু’দিনে একবারও বের হয় নি। একটি মৌমাছিও বের
হয় নি তার চাক থেকে। ওরা ওদের চাকে নিথর বসে রইলো। ওরা যেন অপেক্ষা করছিল। আমার দাদু
ত’ চেরনোবিলে বিষ্ফোরণ বিষয়ে কিছু জানতেন না। তিনি গোটা উঠোনের এমাথা ওমাথা করছেন:
এটা কি? কি চলছে এসব? প্রকৃতিতে কিছু একটা ঘটেছে। ওদের নিজস্ব ভুবনে ওরা কি কোন সঙ্কেত
পেয়েছে? এক প্রতিবেশী, তিনি শিক্ষক, আমাদের বললেন যে পশু-পাখি-পোকামাকড় আমাদের চেয়ে
ঢের আগেই প্রকৃতির রাজ্যে ঘটা যে কোন বিপর্যয়ের সংবাদ পেয়ে যায়। রেডিওতে কেউ কিছু জানাচ্ছে
না, সংবাদপত্রেও না, অথচ মৌমাছিরা জেনে যাচ্ছে। মৌমাছিরা বের হলো তৃতীয় দিনের দিন।
আমাদের বারান্দার রোয়াকে বাসা বেঁধে ছিল কয়েকটি বোলতা। কেউ ওদের স্পর্শও করেনি। পরদিন
সকালে ওদের আর খুঁজে পেলাম না- না জীবিত কি মৃত। ছয় বছর পর ওরা ফিরে এসেছিল। তেজষ্ক্রিয়তা:
এটা মানুষ এবং প্রাণীজগৎকে আতঙ্কিত করে। পাখিদেরও। এবং গাছেরাও ভীত হয়, যদিও তারা খুবই
নীরব থাকে! গাছেরা ত’ কাউকে কিছু বলবে না। এটা একটা দূর্র্যোগ ত’ বটেই। সবার জন্য।
তবে কলোরাডো কাঁচপোকা গোটা বাগানেই দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে। আগের মতোই। আমাদের আলু খেয়ে
ফেলছে। আলুর তলা পর্যন্ত তারা খেয়ে ফেলে। ওরা বিষে অভ্যস্ত। আমাদের মতোই।
তবে আমি যদি এসব বিষয়ে ভাবি- সেই সময়টা সবার বাসায় কেউ না কেউ
মরছে। এই রাস্তার উপরে, ঐ নদীর ওপারে- নারীরা পুরুষ ছাড়া সর্বত্র, কোথাও কোন পুরুষ
নেই। সব পুরুষ মরে গেছে। আমাদের সড়কেই মরলো। আমার দাদু জীবিত এবং তিনি একজনের সংখ্যা
বাড়ালেন। ঈশ্বর যেন পুরুষদেরই আগে তুলে নেন। কেন? কেউ আমাদের বলতে পারে না। তবে আপনি
যদি এবিষয়ে ভাবেন- দেখবেন যে পুরুষেরাও যদি আমাদের মেয়েদের অনুপস্থিতিতে বেঁচে থাকতো,
সেটাও ত’ ভাল কিছু ছিল না। জীবিত পুরুষেরা মদ গেলে, ওহ কি যে মদ গেলে! বেদনা থেকে।
আর আমাদের মেয়েরা সব বন্ধ্যা। তারা কেউই যথাসময়ে সন্তান জন্মদান করতে পারেনি।
আমার আর বেশি কি-ই বা বলার আছে? তোমাকে বাঁচতে হবে। এই হলো
শেষ কথা।
আর একটি বিষয়। চেরনোবিলের দূর্ঘটনার আগে নিজেদের ননী কিম্বা
মাখন আমরা নিজেরাই মন্থন করতাম। আমরা দুধে ভেজা পিঠে সিদ্ধ করতাম। শহরে মানুষ কি এসব
খায়? শহরে তোমরা খানিকটা ময়দার উপর কিছু জল ঢালো আর ময়দা জলের সাথে মেশাও, তারপর ময়ানের
খানিকটা ছেঁড়ো, ফের আবার এই ময়ানের টুকরো পাত্রে খানিকটা সেদ্ধ জলের সাথে মিলিয়ে দাও।
সেটা সেদ্ধ করে তার সাথে আবার খানিকটা দুধ মেশাও। আমার মা এটা আমাকে দেখিয়েছে এবং তিনি
বলবেন, ‘বাচ্চারা- তোমরাও এটা শিখবে। আমি আমার মা’র কাছ থেকে এটা শিখেছি।’ আমরা বার্চ
এবং মেপল গাছের রস খেয়েছি। আমরা উনুনে শিম সেদ্ধ করেছি। আমরা লালচে বেরি ফলে চিনি দিয়ে
জ্বালিয়েছি। আর যুদ্ধের সময় আমরা কাঁটা বিছুটি আর হাঁসের পা দিয়েছে। ক্ষুধায় আমরা মোটা
হয়ে গেছি। তবু আমরা মরে যাইনি। অরণ্যে বেরি ফল আর ব্যাঙের ছাতা পাওয়া গেছে। অথচ চেরনোবিলের
পর আর কিছুই পাওয়া যায় না। কর্তৃপক্ষ তোমাকে ব্যাঙের ছাতা অথবা বেরি ফলও খেতে দেয় না।
আগে আমার ধারণা ছিল তোমার রান্নাঘরের উনুনে যেসব খাবার সেদ্ধ হয়, তা’ কখনো বদলায় না।
কিন্তÍ আসলে বিষয়টা তেমন না।
: আন্না বাদায়েভা, পুনর্বাসনকারী।




0 comments:
Post a Comment