অনুরূপ ভৌমিক


অঙ্কের দিদিমণি 


(৩)

তো, এই হ’ল সুস্মিতার ব্যাকগ্রাউন্ড। কানাঘুষো আর গুজবে সংগৃহীত মিথ জুড়ে একটা বালিকাবেলার কাহিনী। তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের চেষ্টা বৃথা। মিথ্যে হ’লেই বা ক্ষতি কী ? যে মিথ্যে বারবার উচ্চারণে প্রতিষ্ঠিত, তা-ই সত্য। আমরা যখন সুস্মিতাকে পাই, আমাদের গল্প সেখানে থেকে। পাই বলা ঠিক হ’ল না। পাবার স্বপ্ন বলা যায়। কেন না, সুস্মিতাকে কেউ কখনো পায়নি।

আমাদের ছোট্ট শহরে সে সময় সুস্মিতা ছিল এক সাড়া জাগানো রমণী। মেয়ে, মহিলা, তরুণী বা যুবতী তার সঙ্গে খাপ খায় না। সুস্মিতাকে দেখে রমণেচ্ছা হয়নি এমন পুরুষ ঐ অঞ্চলে ছিল না।  আশপাশের মফস্বলেও অমন সুন্দরী ছিল না। সুস্মিতা কারও দিকে তাকিয়ে দেখেনি। দেমাকে নয়, এম্নি-ই। সে বড় অন্যমনস্ক। বাবাকে দেখার পর, মায়ের মৃত্যুর পর, পুরুষদের দেখার ইচ্ছেই চলে যায়। বয়সোচিত হরমোনের প্রভাবেও বিপরীত লিঙ্গ সম্পর্কে কৌতূহল জাগলো না। সৌন্দর্যয়ের কারণে খেলার সঙ্গী না জোটায় উস্কে দেওয়ার মতো কেউ হ’ল না। শরীরের সব কোষ রয়ে গেলো অপাপবিদ্ধ। কত কামনাতর দৃষ্টি প্রতি মুহূর্তে বিদ্ধ করছে সে সম্পর্কে সুস্মিতার ধারণা ছিল না। লক্ষ্য করলে বুঝতে পারত এই ভক্তকুলের বয়সের লোয়ার লিমিট(১৫-১৬)ছিল, আপারটা ছিল না। ষাটের মানুষদেরও বুক হু হু ক’রে উঠত। সহপাঠী, ইউনিয়ন লিডার, অধ্যাপক, উঠতি মেরিন এঞ্জিনিয়ার, উচ্চাকাঙ্ক্ষী অ্যান্টিসোস্যাল, কমিউনিস্ট কাউন্সিলার, প্রতিষ্ঠিত প্রোমোটার-অনুচ্চারিত পাণিপ্রার্থীর তালিকা ছিল বৈচিত্র্যপূর্ণ ও দীর্ঘ। এক দল ভাবত সময় ফস্কে যাচ্ছে, বয়সের শেষ সীমার মানুষরা ভাবত সময় ফুরিয়ে আসছে, জীবনটা বৃথাই গেল। প্রস্তাব দেবার সাহস ছিল না কারোর; না নিষিদ্ধ, না সামাজিক। সুস্মিতার ত্বকের আভা আর নাকের ডগায় জমে-থাকা ঘামের বুদ্বুদে তাদের আত্মবিশ্বাস ভেঙে পড়ত। বিলাসবহুল বাংলোর কাছে নিছক সার্ভেন্টস কোয়ার্টার মনে হ’ত নিজেদের। এভাবে চলতে চলতে সুস্মিতা কলেজে পৌঁছে গেল। এই অবস্থায় চুরানব্বইয়ের গ্রীষ্মে বাড়ির সামনে পিচগলা রাস্তার মাঝে সুরঞ্জন তাকে প্রোপোজ করে। তখন লু বইছে, শুনশান রাস্তা সদ্য নিভে যাওয়া প্রাণবন্ত এক আগ্নেয়গিরির সুড়ঙ্গ হয়ে আছে। আঁচে সুস্মিতার গোলাপি গাল আরো টুসটুস ক’রে তুলেছে। সুরঞ্জন বলে, জানি এটা ঠিক সময় নয়, তবু মনে যখন এসেছে বলেই ফেলি। গলে যাওয়া পিচে সুস্মিতার চটি আটকে গিয়েছিল। সে জোর দিয়ে পা তোলে, চড়চড় শব্দে ছায়ায় ঝিমোতে থাকা কুকুর ফিরে চায়। রোদ ঠেকাতে সুস্মিতা আঁচল টেনে ঘোমটা দেয়। হাতে ছিল লাইব্রেরি থেকে আজই তোলা দুটো বই- হার্স্টিনের ‘ট্রপিকস ইন অ্যালজেব্রা’ আর লোনির ‘কো-অরডিনেট জিওমেট্রি’ । স্কুটার সাইড ক’রে বইদুটো ধরে সুরঞ্জন। রাস্তা পেরিয়ে ফেরৎ নেয় সুস্মিতা। যেন খুব ব্যস্ত এমনভাবে সুরঞ্জন বলে, ‘ও হ্যাঁ, যা বলছিলাম... যাক বলে আর কী হবে... আর যা রোদ... থাকগে ওসব, এই নাও, এতেই সব লেখা আছে’, একটা বড় সাদা খাম দেয় সে। ‘ এটা রাখো, পরে জানিও’ সুরঞ্জন স্কুটারে বসে। লোহার গেটের ওপর অর্ধচন্দ্রাকারে বেড়ে ওঠা বোগেনভেলিয়ার ঝাড় তাপে চুপ্‌সে গেছে, তার ক্লান্ত ছায়ায় দাঁড়িয়ে সুস্মিতা জানতে চায়, কী আছে এতে? এই প্রথম সে কোনো পুরুষের দিকে এত সরাসরি তাকাল। দেখায় কষ্টেসৃষ্টে পাশ মার্ক পাবে, স্ট্রেট-ফরওয়ার্ড বলে কিছুটা গ্রেসমার্ক। সুরঞ্জন বলে, ‘প্রোপোজাল। তবে প্রেমপত্র নয়। বায়োডাটা। ফুল-লতা-পাতা-জ্যতস্না-পাহাড়-সমুদ্রের মতো সুন্দর তুমি নও। তাজমহলের কথা ক্লিশে হ’য়ে গেছে। আর চাঁদ বড্ড এবড়োখেবড়ো, পাথুরে। এতে আমার হাইট, ওয়েট, এডুকেশন, ইনকাম, অ্যাম্বিশন, অ্যাড্রেস, ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ড, এক্সট্রাকারিকুলার অ্যাক্‌টিভিটিজ...এইসব কথা আছে। হ্যাঁ হলে জানাবে, না হলেও দুঃখের কিছু নেই। দূর থেকে ঝাড়ি মারব’, স্কুটারে স্টার্ট দেয় পাঁচ-নয়ের শ্যামলা ছেলেটা, ‘তাড়া নেই, ভাবো। ডিসিশান পরে নিলেও চলবে।’ গিয়ার ঘুরিয়ে রওনা দেয় সুরঞ্জন। থতমত সুস্মিতা খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে, পেছন ফেরে না। সে বুঝতে পারে দোতলার বারান্দায় মরচে পড়া রেলিং-এর ফাঁকে দুটো চোখ বিস্ফারিত হ’য়ে আছে। নীচের ভাড়াটে একটা বুড়িও কি দেখছে না? দেখুকগে। কোনোদিকে না তাকিয়ে সুস্মিতা ওপরে ওঠে।

দশ ফুট চওড়া পঁয়ত্রিশ ফুট লম্বা বারান্দায় সিঁড়ির মুখে সুস্মিতার ঘর। মায়ের ঘরটাই সে নিয়েছে। বারান্দার ঐ প্রান্তে উল্টোদিকে দেবপ্রসাদের ঘর। ঐ ঘরে শরদিন্দুর গল্পের জটিল বুড়োদের মতো সে খুটখাট করে। বার্মা টিকের আলমারি খুলে গোপন কাগজপত্তর নিয়ে সে কী সব যেন করে ডিম লাইট জ্বেলে। রাতভর ব্যস্ত থাকে। দিনের বেলাটা দেবপ্রসাদের বারান্দাতেই কাটে। মাঝে মাঝে পেছনের জানালা দিয়ে রেললাইনের ওপারের জমিজমা দেখে, যে-জমি বহু আগে নিজেই ছেড়ে দিয়েছে। কখনও ডানদিকের পুকুর দেখে, যে-পুকুর তার সহ্য হয়নি। এখন লেফটেন্যান্টের ছেলে সেখানে মাছ চাষ করে। সবই চোখের সামনে আছে, শুধু তার নেই। দায়িত্ব আর পরিশ্রমের ভয়ে সে-ই সব থেকে দূরে পালিয়েছে। অনেকটা একই কারণে সে মেয়ের কাছে পৌঁছতে পারেনি, অল্প চেষ্টার পর হাল ছেড়ে দেয়। মনের জটিলতা তাকে এমনভাবে গ্রাস করে ছিল যে পুনরায় ফেরার চেষ্টা করা হয়নি। তাতে অধিকারবোধ অবশ্য একটুও কমেনি। কেউ না মানলেও না। দিনের বেলা সে শুয়েবসে কাটায় বারান্দার ইজিচেয়ারে। এমন একটা জায়গায় যেখান থেকে পূর্বদিকের জানালা খুললে সুস্মিতাকে দেখা যায়। ঠিক সুস্মিতাকে নয়, শুয়ে থাকা সুস্মিতার পায়ের দিকটা। যদিও এই কারণে ঐ জানালা সুস্মিতা কখনও খোলে না। সে দক্ষিণের দুটো জানালা দিয়ে রাস্তা দেখে, অচেনা লোক দেখে। পশ্চিমের জানালা দিয়ে দেখে রেললাইন, তার ওপারের সেই জমি, যার সুখ ও দুঃখের ছবি এখনও স্মৃতিতে উজ্জ্বল। সুস্মিতার কোন জানালা কখন খোলা মানুষ জানে। তারা ঘুরঘুর করে দর্শনের আশায়। নানা ছুতোয় তারা থমকে যায় জানালার কাছে। অবস্থা বুঝে একটা চায়ের গুমটিও হয়েছে। সাইনবোর্ড নেই, তবু লোকে বলে ‘সুস্মিতা টী স্টল’। কেউ কেউ বলে ‘ভিউ পয়েন্ট’।

ঘরে ঢুকে সুস্মিতা খাম খোলে। পরিষ্কার এ-ফোর সাইজের টাইপ করা কাগজ। চাকরির দরখাস্তে যা যা থাকে সব। পরিচ্ছন্ন সিভি। নীচে একটা সই-ও আছে। সফটয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। মাঝারি মাপের একটা কোম্পানিতে সবে শুরু করেছে। সুস্মিতা হিসেব ক’রে দেখল তার চেয়ে সাত বছরের বড়। এর আগে কখনো প্রেমপত্র পায়নি সে। পেলে, ইনিয়েবিনিয়ে লেখা শব্দসম্ভার নিয়ে সে কী ক’রত ? বিরক্তই হ’ত নিশ্চিত। অবধারিত সেখানে ‘ভালবাসা’ বা ‘প্রেম’ থাকত, রুপ-গুণের স্তুতি থাকত কালিদাসের জমানার ভাষায়। নিজের বক্তব্য কে বিশ্বাসযোগ্য করানোর জন্য একগাদা মিথ্যে। ‘লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট’ হয় নাকি? কাম অ্যাট ফার্স্ট সাইট, হ’তে পারে। না, ঐ চিরাচরিত ঝামেলা থেকে অন্তত ছেলেটা মুক্তি দিয়েছে। যা জানা যায় না, জানায়নি, যা জানানো সম্ভব সেটুকুই করেছে। নরমসরম কাব্যির চেয়ে এ স্টাইলটা ভাল। এরকম প্রেমপত্র কাউকে পেতে শোনেনি। তবু চোদ্দ পয়েন্টের পরিচ্ছন্ন হরফগুলোর মধ্যে সে অনুভব করে, ছেলেটা অল্প হলেও রোম্যান্টিক। টাইপমেশিন যা চাপতে পারেনি। সিভি-তে নেই এমন অনেক কিছু সে দেখতে পায় যেন। আর, ক্রমে শরীরে কেমন যেন হালকা ক্ষরণের অনুভুতি হয়। শরীর থেকে কিছু যেন বেরিয়ে যেতে চাইছে। খাটের ছত্রি ধরে সে দাঁড়িয়ে থাকে। সামান্য একটা সিভি-র প্রতিক্রিয়া এমনও হতে পারে ! হয়তো, সামান্য উপলক্ষের অপেক্ষায় ছিল শরীর। অনেকদিন পর সুস্মিতা পুবের জানালা একটু ফাঁক করে, অনুকম্পার দৃষ্টিতে চায় ইজিচেয়ারের দিকে। একটিবার মাত্র। দেবপ্রসাদ চমকে চোখ ফেরায় দাবা বোর্ডে। আর, সুস্মিতা সিভি-টা অ্যাকসেপ্ট করে।

পরের ক’টা দিন চমৎকার কাটল সুস্মিতার। সেই ঠাকুর্দার সঙ্গে সময় এত ভাল লাগত। মা গুনগুন করতে করতে তেল চুকচুকে চুল বেঁধে দেওয়ার সময় এত ভাল লাগত। পরের পনের দিন রিক্সা আর স্কুটারে দেখা হল বেশ কয়েকবার; সুরঞ্জন ও সুস্মিতার। সুস্মিতার মন ছেয়ে গেল ভাললাগায়। ক্লাসের শেষে কলেজ চত্বরের বকুলতলায় সুস্মিতা বসে রইল অকারণ। মাথার ওপর ঝরে পড়া ফুল সরিয়ে দিল না।

এর মাঝে একদিন সুস্মিতাদের বাড়ি যায় সুরঞ্জন। সুস্মিতা বেরিয়েছিল কেনাকাটায়। দেবপ্রসাদ চিরাচরিত দৃশ্যে একভাবে ছিল। সস্তার বাংলা একাঙ্কের মামুলি মঞ্চসজ্জার মধ্যে। সেই তেপায়া টেবিলে দাবাবোর্ড, পুরনো ইজিচেয়ার আর ক’টা খবরের কাগজ। দুজনের কুড়ি মিনিটের সাক্ষাৎকারের পনের মিনিট চলে যায় ববি ফিশার আর বরিস স্প্যাস্‌কি ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপের মতো। দুই গুরুগম্ভীর প্রতিদ্বন্দ্বী বোর্ডে ঝুঁকে, থুত্‌নিতে হাত, নিবিষ্ট চোখ-এমন ক্লোজ-আপ। বাকি পাঁচ মিনিটের ইতস্তত কথোপকথন ছিল এই ধরণেরঃ-
-তাহলে তুমি দাবা জানো একটু আধটু।
-অল্প। আর, তাতেই বুঝছি, আপনি তেমন জানেন না।
-সুমির দিকে দেখছি কিছুটা এগিয়েছ।
-আমি একা এগোলেই কি হবে?
-সেটা পরের কথা। তোমার সাহস বলিহারি। এমন চেহারা নিয়ে এগোলে কি করে?
-চেহারা দিয়ে কিছু হয়? চেহারা ক’দিন থাকে?
-ব্যাকগ্রাউন্ড আছে ম্যাচ করার মতো?
-তা দিয়েই বা কী হয়?
-হবে না। কিছু হবে না। আমার আপত্তি আছে। এ সম্পর্ক হওয়ার নয়, টেঁকার নয়।
-সে কথা না হয় সুস্মিতাই বলুক।
-সে বলুক। কী বলবে আমি জানি। তবে, তোমায় মানাবে না।
-তা ঠিক। একসঙ্গে বেরলে লোকে ড্যাবড্যাব ক’রে চেয়ে থাকবে। পরে অভ্যেস হয়ে যাবে, মেনে নেবে।
-নেবে?
-আপনার মেয়ে ব’লে যখন মানতে পেরেছে আমারটাও পারবে।
আঁতে লাগে দেবপ্রসাদের। বহু পুরনো ফোঁড়া ফেটে যায় যেন। সে গুম হয়ে যায়, তারপর কিস্তি দেয়। সুরঞ্জন বলে, ‘ ঐ ঘর থেকে মন্ত্রী সরবে না, রাজা ধরা আছে’।

প্রথম সাক্ষাৎকারে দেবপ্রসাদের মনে হয় ছেলেটা টেটিয়া। সুরঞ্জনের মনে হয় লোকটা আলস্যের চর্চা করতে করতে অ-সুখের সাধনা করছে। তিনটে বোড়ে, একটা ঘোড়া আর একটা নৌকা খেয়ে এবং দুটো বোড়ে ও একটা গজ খুইয়ে। সুরঞ্জন উঠে পড়ে। ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপ অমীমাংসিত থাকে। দেবপ্রসাদ জানতে চায়, ‘নেক্সট কবে আসছ?’ সুরঞ্জন ভাবে ‘বাঞ্চোৎটা পাগল’, বলে ‘শিগগিরই’।

দেবপ্রসাদের সঙ্গে কথোপকথনের বর্ণনা সুরঞ্জন দেয়নি। সুস্মিতাও আগ্রহ দেখায়নি। বাড়ি এসেছিল, ফিরে গেছে ব্যাস। পরের সাতদিনে দুজনের দেখা হ’ল চারবার। সুরঞ্জন এগোচ্ছিল রাজধানীর গতিতে। প্রথমবার সুরঞ্জন বলে, বলার দরকার নেই, জানি তোমার উত্তর হ্যাঁ। দ্বিতীয়বার হাত ধরে। তৃতীয়বার ফাঁকা দেখে জড়িয়ে ধরে। চতুর্থবারে চুমু এবং বিপর্যয়ের শুরু। শরীর কেঁপে উঠল, সব রোমকূপ আবর্জনা সরিয়ে শ্বাসমুলের মতো জেগে উঠল, কিন্তু, সুরঞ্জনের লালার স্বাদ পেতেই কেমন একটা প্রতিরোধ চাগাড় দিল। তখনই সে পেল পিঁপড়ে চিবিয়ে ফেলার রসালো নোনতা স্বাদ। দাঁতের স্পর্শে পেল সাইট্রিক অ্যাসিডের জ্বালা।
-কী হ’ল? নির্লিপ্ত বাধা পেয়ে জানতে চায় সুরঞ্জন।
-কিছু না। অন্য কিছু করো। কথা বলো।
-তা না হয় বলব, কিন্তু হলটা কী?
-কিছু না কেমন যেন পিঁপড়ের মত কিছু একটা, কী যেন... থেমে যায় সুস্মিতা। নিজের কানেই নিজের গলা অদ্ভুত শোনায়।
-তোমার ফ্যামিলির কন্সটিটিউশানে গোলমাল আছে মনে হয়, দুশ্চিন্তায় পড়ে সুরঞ্জন। সে বলে, আজ যাই। একটা প্রোজেক্টের কাজ আছে, অনেক রাত অবধি ক’রতে হবে।

সুস্মিতার আনন্দ দীর্ঘস্থায়ী হয় না। দিন সাতেক পর সকালবেলায় অফিস যাওয়ার পথে সুরঞ্জন একটা খাম ফেলে সুস্মিতাদের লেটারবক্সে। ওপর থেকে দেখে সুস্মিতা। পাশের পুকুরে তখন টানা জাল দেওয়া হচ্ছে। দেড়-দু-কেজি সাইজের রুই-কাৎলার সঙ্গে হাইব্রিডরা লাফাচ্ছে। সুরঞ্জন হাসি মুখে টা-টা করে। সুস্মিতা নীচে নেমে চিঠি নেয়। এটা রেজিগ্‌নেশন লেটার। ঐ ফরম্যাটেই লেখা। এবার হাতের লেখায়। বক্তব্যঃস্যরি। এটা হবে না। ব্যাঙ্গালোর যাচ্ছি বেটার কাজ নিয়ে। ছ’মাস পর ওরা বিদেশ পাঠাবে। কতদিন থাকতে হবে জানি না। কেরিয়ারের এই পয়েন্টে কিছুতে জড়ানো আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তাছাড়া রোজ বিকেলে দাবা খেলাও অসম্ভব। সুস্মিতার মনে হয় ছেলেটা জেনুইন, হয়ত বিবেচকও। সুস্মিতার সঙ্গে সম্পর্ক টেঁকার নয়, বুঝতে পেরেছে শুরুতেই। বুঝতে পেরেছে অ্যান্টিক বাড়ি, ভুতুড়ে একাকীত্ব আর কুচুটে বাবাকে নিয়ে অনিচ্ছাসত্বেও সুস্মিতা এখানেই থেকে যাবে। সুরঞ্জনকে আর দেখা গেল না। দেখার ইচ্ছেও করল না। দুঃখ কিংবা রাগ হল না। সুস্মিতা যে অবস্থায় ছিল সেখানে ফিরে গেল। মাসখানেকের একটা সংক্ষিপ্ত ভ্রমণ সেরে। বলা যাবে না, তার মধ্যে প্রেমে চোট খাওয়ার ক্ষত রইল। ভালবাসাই হল না, বেদনা কিসের! রয়ে গেল একটু অনভিজ্ঞতাজনিত অপমানবোধ। আর ম’নে হল, ছেলেটার অ্যাপ্লিকেশন ও রেজিগ্‌নেশনের মধ্যে গ্যাপটা বড্ড কম। এরকম হ’লে কোনও কোম্পানিতে ওপরে ওঠা মুশকিল।

সুরঞ্জনের দুটো চিঠি শহরের পুরুষদের অনুপ্রাণিত করেছিল। সুরঞ্জন চলে যাওয়ার পর সুস্মিতাদের বাড়িতে চিঠিপত্রের ধুম লেগে গেল। বড় লেটারবক্স উপচে মাটিতে ডাই হ’য়ে গেল। হড়কা বানের মত শূন্য থেকে চিঠির ঢল নেমে এল। ক্যুরিয়ার সার্ভিস, পাড়ার ছোট বাচ্চা, কাজের মহিলা, পায়রার ঠোঁট, সরকারী ডাক পিওন, বীমা দপ্তরের এজেন্ট, ব্যাঙ্কের স্টেটমেন্ট – সম্ভাব্য যে কোনও পথে প্রেমপত্র উড়ে চলল সুস্মিতার উদ্দেশ্যে । প্রেরকদের আবেদন এক্তাইঃ এবার আমাদের সুযোগ দেওয়া হোক। যথাসাধ্য চেষ্টা ক’রব খুশি রাখার। স্বনামে-বেনামে, ঠিকানাসহ কিংবা ছাড়া; সব বৈচিত্র্যে। ‘হ্যাঁ’ হ’লে কি করতে হবে তার সিনেমাটিক নিদানও ছিল কিছু আবেদনপত্রে। জানালায় রুমাল বেঁধে রাখা, ছাদে নীল শাড়ি শুকোতে দেওয়া, বাসন্তী রঙের শাড়ি পরে দোকানে যাওয়া কিংবা লাল টিপ লাগিয়ে কলেজ যাওয়া- এমন হাজারো বায়নাক্কা। স্তুতিতে ভরা কিছু চিঠিতে সংস্কৃত সাহিত্য থেকে রবিঠাকুর পর্যন্ত শব্দরাশি ঢুকে পড়ে বিপজ্জনক বানানে। প্রথমদিকের কয়েকটা খোলার পর সুস্মিতা আর ফিরেও তাকাল না। কিন্তু ফেলতেও মায়া হ’ল। ঘরের বাইরে সে বানাল একটা বরসড় বাক্স, ব্যাঙ্কের চেক ড্রপ-বক্সের মত। না-খোলা চিঠিগুলো জমতে থাকল সেই বাক্সে। মাসখানেকের পর চিঠির সংখ্যা কমতে কমতে মিলিয়ে গেল। শহর সব উন্মাদনা ভুলে আবার নিজস্ব একঘেয়েমিতে ফিরে এল। মামা-মাসিদের স্নেহ আর দুশ্চিন্তায় ভরা মাসে মাসে আসা চিঠি অবশ্য বন্ধ হ’ল না। সেগুলোর শেষদিকে অবধারিতভাবে থাকত কটা ছোট বাক্য-‘অনার্সের পর আর পড়তে হবে না। ছেলে দেখছি। এ ব’ছরই বিয়ে বাবাকে ছেড়ে চলে আয় ’

সম্পর্ক না থাকলেও বাবাকে ছাড়া সম্ভব ছিল না। মাঝে মাঝে মামার বাড়ি গেলেও তাৎক্ষণিক স্নেহ কুড়িয়ে ফিরে আসত। নিজের শহর, নিজের অন্ধপুরীতেই সে রয়ে গেল। দূরে যেতে হবে ব’লে এম এস সি ক’রল না। অনার্সটা ভালভাবে শেষ ক’রে সুস্মিতা একদম বসে গেল। ক্কচিৎ কলেজের কেউ আসত। কখনওবা বিকেলের দিকে সে রাস্তায় বেরোত অকারণ, নতুন নতুন গড়ে ওঠা দোকান আর অচেনা ঘরবাড়ি দেখতে। এর মাঝে নানান দিক থেকে সম্বন্ধ আসতে লাগল। আর দেবপ্রসাদ অসীম প্রতিভায় সেগুলো ভাংচি দিয়ে চলল। যেটায়  একটু পেকে ওঠার আশা থাকে, সুস্মিতা নিজেই কেঁচিয়ে দেয়। এভাবে বাপ-মেয়ের যৌথ প্রতিযোগিতায় সুস্মিতা বিয়ের সেরা সম্ভাব্য দিনগুলো পেরিয়ে যেতে থাকল। শহরের দুটো প্রজন্ম দূর থেকে দেখতে দেখতে ক্লান্ত হ’য়ে হাল ছেড়ে দিল। ততদিনে সবাই জেনে গেছে এটা লস্ট কেস। সৌন্দর্যের কী বিপুল অপচয়।

তিরিশ পূর্ণ হওয়ার পর সুস্মিতা এক সকালে পেপার হাউসে গেল। সে কিনল একটা বড় ব্ল্যাকবোর্ড এক বাক্স চক ও ডাস্টার । টানা বারান্দার মাঝামাঝি বড় শতরঞ্চি বিছিয়ে, বাবার ইজিচেয়ার থেকে ঠিক কুড়ি ফুট দুরে একটা কোচিং ক্লাস খুলে বসল। শুধু নাইন-টেনের অঙ্কের ক্লাস। দেবপ্রসাদ আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আমাদের টাকার দরকার  নেই’। সুস্মিতা চুপ ক’রে ব্ল্যাকবোর্ড টাঙাল, পরিপাটি ক’রে মুছল চারপাশ । তারপর বলল, ‘আমাদের কাজের দরকার আছে’, এটাও আকাশের দিকে তাকিয়ে। যা কিনা বহু বছরের মধ্যে বাবার সঙ্গে বলা তার প্রথম সম্পূর্ণ বাক্য।


                                                                     চলবে ... 

0 comments:

Post a Comment

ধারাবাহিক উপন্যাস

ধারাবাহিক অনুবাদ

পুরাতনী

Powered by Blogger.

যোগাযোগ করুন

Name

Email *

Message *

Total Pageviews

Sample Text

আপনাদের ছোটো বা বড় গল্প পাঠান । বিশেষ করে সেই লেখাটি যা কেউ পড়বেনা ভেবে পাঠাননি আগে কোথাও। লেখা পাঠাবার ঠিকানা-mackerelblogzine@gmail.com

*[ লেখা বেছে নেবার ক্ষেত্রে সম্পাদকের রায় চুড়ান্ত বলে বিবেচিত হবে । ]

Copyright © ম্যাকারেল | Powered by Blogger
Design by SimpleWpThemes | Blogger Theme by NewBloggerThemes.com | Distributed By Blogger Templates20