অর্ধনারীশ্বর
মাধ্যমিক পরীক্ষা দেব সে বছর, ২০০৬ সাল। মাধ্যমিকের পর ওখানে কোনো স্কুল ছিল না। সব ছেড়ে বাইরে চলে যেতে হবে। একটা অজানা মন খারাপ নিয়ে সরস্বতী পুজোর দিন, আমাদের স্কুলের মাঠে একা একা বসে আছি । আমার বাবা ছাপোষা স্কুল মাষ্টার, সেদিন পূজো প্যান্ডেল থেকে বাড়ির দিকে ফিরছিলেন। আমাকে অমন ভাবে বসে থাকতে দেখে দেখে, এগিয়ে এলেন। ‘তুমি একা বসে?’ আমি কি উত্তর দেব ভাবতে না ভাবতে তিনি আমার পাশে এসে বসলেন। তারপর কিছু কথা বলেছিলেন। যা এতগুলো বছর পেরিয়ে এসে বুঝতে পারি সেগুলো কতখানি মূল্যবান নিজের কাছে। মনে পড়ে বাবা সেদিন বলেছিলেন- “দুদিন পর তোমাকে বাইরে চলে যেতে হবে। সেখানে কেউ ভালো মন্দ দেখিয়ে দেবার কেউ থাকবে না। এমন কিছু কখনোই কোরো না, যা তোমার বা আমাদের, আত্মসম্মানে না লাগে”। অবশেষে মাধ্যমিক শেষ হল। তল্পিতল্পা গুছিয়ে কয়েকশো কিলোমিটার দূরের স্কুলে, দু’বছরের হোষ্টেল জীবন। সেসব শেষ করে অবশেষে ২০০৮ প্রথম কোলকাতায় এলাম। শুরু হল নতুন লড়াই।
কলেজের
ক্লাস, আর তার বাইরে সোনারপুরের দশ বাই দশের মেস বাড়িতে কোনক্রমে মুখগুঁজে বেঁচে
থাকা। একটু হাবাগোবাই ছিলাম চিরকাল। বন্ধুদের কেউ কেউ আমায় নিয়ে তাই হাসাহাসি করতো। সাধারনত সে কারনেই কলেজ যেতে ইচ্ছে করতো না। তেমন
কোনো বন্ধুও হল না যে দুটো মন খুলে কথা বলতে পারি। সেই থেকে একা হতে থাকলাম। নদীর পাড়ে পাড়ে যে ছেলে
ঘুরে বেড়াতো, মন খারাপে খোলা মাঠে যে বেরিয়ে
পড়তে যে কখনো দ্বিধা করত না। আচমকা এমন একটা অদ্ভুত চিড়িয়াখানায় ঢুকে পড়ে, সে সব কিছুই
ঝাপ্সা দেখতে শুরু করলো। এর মধ্যেই রেজাল্ট এলো, কোনো এক অজানা রহস্যে দেখলাম কলেজে
পাশ করতে পারিনি। খুব ভালো স্টুডেন্ট কোনো কালেই ছিলাম না। তবে এতটা খারাপ নয় যে
ফেল করে যাব। বাড়ির লোক গুলো হঠাৎ করেই যেন বোবা হয়ে গেল। কেউ কিছুই বলছেনা। সেই নিরবতার জের দিন পেরিয়ে
বছর পেরোতে চলল।
এসময়ই বুঝতে শিখেছিলাম ‘নিরবতার থেকে
বড় কোনো আর শাস্তি হয়না’। রোজ সরস্বতী
পুজোর দিনে বাবার বলা সেই কথা গুলো মনে পড়তো। কি করবো এরপর? কেনই
বা আমার বেঁচে থাকবার কথা কাউকে হাত পা ছুঁড়ে জানাতে পারছিনা? এমন সব অজস্র প্রশ্ন
আমাকে রোজ আক্রমণ করতে শুরু করলো। মুক্তি মিললো না কিছুতেই।
এমনই এক
দুর্দিনে নিছক কৌতূহলে এক ইউনিভার্সিটির দাদার কাছে কিছু জানতে চেয়েছিলাম। সে সেসব উত্তর না
দিয়ে, কেবলমাত্র আমার শিক্ষাগত যোগ্যতা তুলে সেদিন খুব অপমান করেছিলো। মনে পড়েখুব আত্মসম্মানে
বেজেছিলো কথা গুলো। জেদ চাপলো,
জানবো। নিজের মত করে শুরু করলাম পড়াশোনা। কিন্তু তার আতিশয্যে আমার
সহজ বোধ ছেড়ে মাথার মধ্যে ঘুরতে শুরু করলো কঠিন সমস্ত ‘তত্ত্ব,’ আর ‘ইজম’ নিয়ে ফাঁপা সব অহংকার। একটু একটু করে জটিল, আর ভিতরে ভিতরে আরো বেশী
বেশী অহংকারী হতে শুরু করলাম । কিন্তু কিছুটা দূর যাবার পর আমার সেই অহংকারের
মুখোশটা নিমেষে টেনে খুলে দিলেন একজন সহজ মানুষ। তার সাক্ষাতে বুঝতে পারলাম একটা
ভুল দিকেই দৌড়ে চলেছি। আমার যে সহজ মন, যা আমার জন্মগত। লক্ষ করলাম সেসব এই জটিল কংক্রিটের তলায় পড়ে ছটপট
করছে। বেরিয়ে এলাম সেসবের থেকে, বলা ভালো বেরিয়ে আসতে চেষ্টা করলাম । কিন্তু ‘পারলাম
কি’?
এই প্রশ্নটা
মাথায় নিয়ে কাজ শুরু করেছিলাম
“অর্ধনারীশ্বর” –এর। voice of silence নামের একটি ছবি নির্মাণের ব্যর্থ
চেষ্টায় ভিতর থেকে একেবারেই ধংস হয়ে গিয়েছিলাম। কিছুই করতে পারছিলাম না মাঝের সময়। অভিষেক দা(এই ছবির চিত্রগ্রাহক)একদিন খোঁচা দিল। একেবারে বসে না থেকে কিছু একটা তো করতে পারি।
অন্তত দু’এক মিনিটের। অভিষেকদার কথায় কি যেন একটা ম্যাজিক ঘটে গেল নিজের মধ্যে। ভাবলাম নিজেকে নতুন করে তৈরি
করতে হবে।
আমরা ঠিক
করলাম ‘নববর্ষ’-র জন্যে একটা এক মিনিটের কাজ করবো। নতুন বছর, নতুন দেওয়ালে নতুন
ক্যালেন্ডার। এটুকুই সাব্জেক্ট। ছকে ফেললাম মনে মনে। দুদিন পর মনে হল- নববর্ষ
মানেই কি শুধুই ক্যালেন্ডার? মনে পড়লো আমাদের গ্রামের বর্ষ বরনের কথা। মনে পড়লো ‘ঝাঁপান’, ‘চড়ক’ আর আমাদের ফেলে আসা ‘গোষ্ঠ’র মাঠ। আর সেভাবেই গল্পে
ঢুকে পড়লো একটি বহুরূপীর চরিত্র। কিন্তু, এই কলকাতার চৌহদ্দিতে
বসে বহুরূপী পাবো কোথায়? মনে পড়লো বাড়ি থেকে কলকাতা যাওয়া আসার পথে অনেকবারই জয়নগর
আর দক্ষিণ বারসাত অঞ্চলের মধ্যে একজন
বহুরূপীকে অনেকবার লক্ষ করেছি। ফোন করলাম ছোট্টুদাকে(মুদাসসার হোসেন,এই ছবির মূলচরিত্র
ও ঐ অঞ্চলে থাকে), যেভাবেই হোক ওনাকে চাই! ছোট্টুদা ফোনেই জানালো, এই বহুরূপী
ভদ্রলোককে খুব ঘনিষ্ঠ ভাবেই চেনে। কিন্তু অনেকদিন তাকে দেখতে পাওয়া যাচ্ছেনা এ অঞ্চলে। অনেক খুঁজে, আরো তিনদিন
পরে ঠিকানা যোগাড় করা গেলো। খোঁজ পেয়ে আমরা দৌড়ালাম তার কাছে। দক্ষিণ বারাসত স্টেশন থেকে প্রথমে ইঞ্জিন ভ্যানে,
তারপর অনেকটা পায়ে হেঁটে সেই বহুরূপী ভদ্রলোকের বাড়িতে পৌঁছানো গেলো। গিয়ে জানলাম
দিন কয়েক আগেই উনি একটি স্টেজ থেকে পড়ে গিয়ে পা ভেঙেছেন। ওদিকে শুটিং এর আয়োজন
একরকম ভাবে প্রস্তুত। নববর্ষের আগেই আমাদের কাজ শেষ করতে হবে। আর এদিকে এইসব কাণ্ডকারখানা
দেখে কিছু কূলকিনারা পেলাম না। কোনো উপায় নেই দেখে ছোট্টুদাকেই চেপে ধরলাম। যে, তাকেই এই চরিত্রে অভিনয়
করতে হবে। ছোট্টুদা প্রথমে খুব কিন্তু কিন্তু করলেও, চাপাচাপিতে রাজি হয়ে গেলো
একরকম ভাবে। ছোট্টুদাদের থিয়েটার গ্রুপের ছেলে বাপ্পা সাইকেলে করে ঘুরে ঘুরে কিছুটা লোকেশন
দেখিয়েছিলো তার আগেই। কিছুটা অভিষেকদাদের কাজের দিদির ছেলে। তাও কিছুতেই মনমত বাড়ি পাওয়া যাচ্ছে না কোথাও। অবশেষে বাপ্পার
দাদুর মাটির বাড়িটা দেখে মনে হল, কোনো রকমে এই বাড়িটাকে সাজিয়ে গুছিয়ে কিছু
একটা করা যেতে পারে। বাড়িটা দুদিনের জন্যে
প্রায় ভিক্ষে চাইলাম তাদের কাছে।খুব খুশি মনেই আমাদের হাতে বাড়িটা ছেড়ে দেবে কথা দিলেন তারা।
কিন্তু সব
কিছু মিললেও মনে মনে গল্পটা অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছে। আর সেভাবেই চিত্রনাট্যে একটা
বাচ্চা মেয়ের সংযোজন। একজন নির্বাক শিশু অভিনেতার প্রয়োজন মনে
হল। কিন্তু তেমন শিশু পাবোটা কোথায়? ছোট্টুদা সবশুনে তার এক তুতো দিদির বাড়িতে নিয়ে গেলেন। সেখানেই রাইকে দেখে আমার বেশ পছন্দ হল। কিন্তু
মনে মনে কোথাও একটা সন্দেহ কিন্তু থেকেই গেলো। মনে মনে নিজেকে স্বান্তনা দিয়ে, আগোছালোভাবে ছোট্টুদাকে স্ক্রিপ্ট বুঝিয়ে
আমি কোলকাতাতে ফিরে এলাম।
শুটিং এর
একদিন আগে অনেকটা রাতে ছোট্টুদার ফোন। যে বাড়িতে শুটিং হবার কথা। তাদের বাড়িতে
ভয়ঙ্কর ঝামেলা চলছে। বিষয়টাও বেশ গুরুতর বোধহয়, ওখানে কাজ করা যাবে না। সারারাত ফোনে ফোনেই কাটলো।
অবশেষে ভোরের দিকে জানা গেল পরিস্থিতি কিছুটা হলেও কন্ট্রোলে। অনিশ্চয়তা জেনেও আগের
দিন নামখানা লোকালের ভিড়ে প্রায় যুদ্ধ করতে করতে আমি আর দেবাশিস(মেক আপ যে বন্ধু
করেছে)লাইট ট্রাইপড আর গুচ্ছের জিনিসপত্র নিয়ে দক্ষিন বারাসত পৌছালাম। আমাকে পৌঁছে
দেবাশিস ফিরে এলো কোলকাতা। ছোট্টুদা আর হাবিবাদির
এক কামরার ভাড়াবাড়িতে আমি
কোনোক্রমে নিজেকে আঁটিয়ে নিলাম।
অনেকটা রাতে
অভিষেকদার ফোন এল। এবং ভয়ে ভয়ে জানালো সে কাজটি করতে পারবে না। কেননা সে আগে কখনো
ফিল্ম শুট করেনি। এতবড় একটা কাজ করতে সে ভরসা পাচ্ছেনা নিজের উপর। ঘাবড়ে গেলাম খুব। এত কিছুর পর থেমে যাব? আমি বললাম- ‘টেকনিক্যাল
পার্টটা শুধু তুমি দেখো, বাকিটা আমার উপর ছেড়ে দাও’। অনেক কিন্তু কিন্তু করেও অভিষেকদা শুটে এল পরের
দিন ।
“গোড়ের হাট”
বলে একটা জায়গায় কুমোর পাড়ার মধ্যে আমাদের শুটিং শুরু হল। কিভাবে যেন লোক জানাজানি হয়ে গেল। মুহুর্তে ভিড়
করতে শুরু করলো স্থানীয় কিছু কৌতূহলী মানুষ। তারা বার বার ফ্রেমে ঢুকে পড়তে শুরু
করলো। ফলে অনেকটা সময় ওখানেই চলে গেল তাদের কন্ট্রোল করতে। আমরা একটা অটো ভাড়া করেছিলাম, সেখানকার কাজ শেষ
করে অটোতে করে পরবর্তী লোকেশনের দিকে রওনা
দিলাম। মাঝ পথে রাই (বহুরূপীর মেয়ের চরিত্র)ও তার মা উঠবে। সেভাবেই ঠিক হয়ে রয়েছে
সব কিছু। কিন্তু রাই, ছোট্টু দাকে অমন একটা অদ্ভুত বেশে দেখে ভয় পেয়ে কাঁদতে শুরু
করেদিল। সেই কান্না ‘পায়রা নই’তে
গিয়েও থামলো না। ‘পায়রা নই’তে যে দোকানে শুটিং করার কথা তার ভিতরটা বড়ো অন্ধকার।
আমরা কাজের নয় জেনেও থিয়েটারে ব্যবহার করা খুব নিম্ন মানের দুটো পাড়ের লাইট যোগাড়
করতে পেরেছিলাম। শুটিং এ শট চলা কালীন আমার কানের থেকে এক হাতের
দূরত্বে সেই লাইটের হাজার ওয়াটের একটি বাল্ব ব্লাস্ট করলো। আধাঘন্টা ডান কানে কিছু
শুনতে পাইনি সে সেময়। কিন্তু সেই অবস্থায় কাজ চালিয়ে যেতে বাধ্য হলাম সময়ের অভাবে। বাইরে এত রোদ আর
ভিতরটা এত অন্ধকার যে লাইট ব্যালেন্স করা
গেলো না কোনো ভাবে। ঝলসে গেলো দোকানের বাইরেটা।
আমরা কোনো ওয়ার্কশপে যাইনি। বলা ভালো সুযোগ
পাইনি। রাই সেই ভয় নিয়েই শট দিতে শুরু করলো। মন ভুলিয়ে যতটা কাজ করানো যায় সেভাবেই
একটু একটু কাজ এগোচ্ছে। ছোট্টু দা শেষ পর্যন্ত
ধৈর্য্য রাখতে পারলো না। তার ছাপ বার বার ধরা পড়তে লাগলো ক্যামেরায়। রাতের শুটিং এ
গিয়ে বুঝতে পারলাম আমাদের অনলাইন থেকে কেনা কিনোটা কোনো কাজের নয়। কিছুতেই
ব্যালেন্স করা যাচ্ছে না লাইট । বুদ্ধি করে অভিষেকদা কিছু বাল্ব কিনে
রেখেছিলো। সেগুলো কাজে এল। কিন্তু
ঘরটা এতই ছোট যে থ্রি পয়েন্ট লাইট করা দূরে থাক, একটা লাইট রিফ্লেক্ট করারও জায়গা নেই। আমাদের কাছে থাকা দুটো লেন্সের
ভালোটি সম্পূর্ন অকেজো হয়ে গেল জায়গার অভাবে। ট্রাইপডটিও কেবলমাত্র স্টিল ছবির
জন্যে, কোনো ফ্লুইডহেডও নেই যে সেটা দিয়ে প্যান বা টিল্ট শট নেওয়া যাবে। সেই অবস্থাতেই কাজ এগোতে
লাগলো। আমার একটি ফ্রেম খুব জরুরী মনে হল। কিন্তু ওইটুকু জায়গায় ওই ফ্রেমনেওয়া
সত্যিই সম্ভব নয়। কিন্তু আমি বেঁকে বসলাম ওই ফ্রেমটাই আমার চাই। অভিষেকদা ক্ষেপেগেল
একটা সময় পর। আমিই ক্যামেরা হাতে নিলাম। পুরো ঘর
জুড়েই একটা খাট, খাটের পাশে সামান্য জায়গায় রাখা ওই বাড়ির গৃহদেবতা। আমি খাটে একটা পা আর আরেকটা পা
কোনো মতে টুলে রেখে ঠাকুরের মাথায় উঠে গেলাম। দুপায়ের মধ্যে ক্যামেরা ঢুকিয়ে একেবারে দেওয়ালে
ক্যামেরা ঠেকিয়ে অন্ধের মত একটা স্টিল ছবি
নিলাম, ফ্রেম ঠিক আছে কিনা দেখতে। দেখলাম অনেকটাই এসেছে। কিন্তু, ফোকাস? আবারো অন্ধের মত
আন্দাজ করে করে কয়েক বারের চেষ্টায় যখন
শটটা পেলাম। তখন টিমের বাকিরা যেন একটু হলেও উৎসাহ ফিরে পেল। প্রথমদিনের শুটিং শেষ করে
সকলেই কলকাতা ফিরে গেল। আমি থেকে গেলাম ছোট্টুদাদের সাথে।
পরেরদিন রাই
অনেক সাবলীল। বেশ বকবক করছে আমাদের সাথে, একটু একটুকরে কাজও এগোচ্ছে। আমাদের মেকাপ
কিট ছিলো না, পোস্টার কালার আর ধুলো মাটি মিশিয়ে মেকাপ করেছিল দেবাশিস। আমাদের এই করুণ পরিণতির কথা
ভেবে নিজেরাই হাসাহাসি করছিলাম নিজেদের মধ্যে। কিন্তু সেদিন এমন একটা দুর্ঘটনা ঘটে গেল যে বিকেলের
মধ্যে অভিষেকদা কে কোলকাতা ফিরে যেতেই হবে। ওদিকে ছোট্টুদার এক্সপ্রেশন কিছুতেই মনমতো
হচ্ছেনা। তাড়াহুড়োয় অনেক আক্ষেপ নিয়েই কোনোক্রমে শুটিং শেষ হল।
বহির্বিশ্বের
যুদ্ধ সেরে এডিট টেবিলে বসলাম সুস্মিতদার সাথে। সুস্মিত দা এনিমেশনের লোক, ওর সাথে অন্য একটি কাজে
আলাপ হলেও প্রায় এক বছর আগে আমাদের শেষ দেখা হয়েছিলো। মাঝে কোনো রকম যোগাযোগও ছিলো
না। একদিন আচমকা ওর ফোন পেলাম ওর মায়ের মৃত্যু সংবাদ জানাতে। আমি তখন ছবিটার প্রস্তুতি নিচ্ছি। কথায় কথায় এই
প্রসঙ্গ উঠলে ছবিটা এডিট করতে আগ্রহ প্রকাশ করে। জন্ম থেকেই ও বাংলার
বাইরে। স্বাভাবিক ভাবেই বাংলাটাও সেভাবে জানা নেই তার। তাই এডিট টেবিলে কিছু কুন্ঠা নিজের মধ্যে থাকলেও,
ওকে বোঝাতে শুরু করি কালীঘাট পেইন্টিংএর দর্শন, বহুরূপী, গাজন গানের মত সমস্ত লোকজ
উপাদান গুলো। ও মনোযোগ দিয়ে সেসব শোনে, আর তাতেই একটা ম্যাজিক তৈরি হয় আমাদের মধ্যে। সবাই যেহেতু নতুন, আনকোরা এডিট টেবিলে আমাদের অনেক বেশী পরিশ্রম করতে হল। যতটা
ভুল ঢাকা যায় তার চেষ্টায় প্রাণপাত করে ফেললাম আমরা দুজন। কিন্তু কত ভালো ভালো ফ্রেম, কত ভালো ভালো ফুটেজ ফেলে দিতে হল এক্সপ্রেশন, আর মুভমেন্ট মেলাতে না
পেরে। খুব উল্লেখ যোগ্য আস্ত একটা সিনই বাদ চলে গেল এ কারনেই।
ফাস্ট রাফ
কাট হওয়ার পর ভেবেছিলাম নিজেরাই সাউন্ড ডিজাইন করবো। কিন্তু সেই সময় সুজয়দার সাউন্ড
স্টুডিয়োতে গিয়েছিলাম অন্য একটি কাজের
ব্যাপারে। কথায় কথায় কাজটার কথা উঠলে সেখানেই ভয়েসটা রেকর্ডিং করাবো মনে মনে ঠিক করে তার
হিসেব নিলাম। কিন্তু সুজয়দা রাফ কাটটা দেখতে চাইলো। ছবিটা দেখে, রেখে যেতে বললো, স্টুডিয়োতে
অনেকেই শিখতে আসে। তাদের যদি কেউ কাজটা করতে চায়। আমি ছবিটা দিয়ে বাড়ি চলে এলাম। তিনদিন পর সকাল বেলা সুজয়দার ফোন –‘দেবরাজ
তোমার ছবির কাজ হচ্ছে দেখে যাও।’ আমি স্টুডিয়োতে
দৌড়ালাম। পৌঁছে দেখি মৌমিতা ফলি রেকর্ড করছে, আর ফলি করছে প্রকাশ। প্রকাশ ফলি আর্টিস্ট নয়। স্টুডিয়োর ছোটখাটো
ফাইফরমাশ খাটে আর স্টুডিয়োতে থেকে পড়াশুনো করে। সুজয় দা প্রকাশকে সুযোগ দিয়েছে কাজ শিখবার যদি ও
কাজটা শিখতে পারে। যেখানে পারছেনা সুজয়দা হেল্প করে দিচ্ছে। আমি এসব দেখে প্রায় আকাশ থেকে পড়লাম। আমার কাছে একেবারেই
পয়সা নেই। এভাবে কাজ করবো কি করে? সুজয়দাকে কাজ থামাতে বললাম। উত্তর এলো -‘তোমার কাছে
কি পয়সা চেয়েছি? তুমি রেকর্ডিং এর জন্যে যেটুকু দেবে বলে ছিলে ওটুকুই দিও। আমার
কাজটা ভালো লেগেছে। তাই আমি নিজেই কাজটা করতে চাই’।
সাউন্ড
ডিজাইনিং এ বসে কালীঘাট পেইন্টিং এর ‘নিরপেক্ষ শূন্য চিত্রপট’ এর প্রসঙ্গ উঠলে
আমরা সিদ্ধান্ত নিই। ছবিটা যেহেতু সম্পূর্ন নির্মেদ ভাবেই বানানো, তাই
ব্যাকগ্রাউণ্ড স্কোরটাও একেবারেই নির্মেদ ভাবে বানাবো। আলাদা করে ইমোশান তৈরিতে
কোনো রকম মিউজিক ব্যবহার করবো না। পুরোটা
এম্বিয়েন্স সাউন্ড ও ফলি দিয়ে গল্পটা বার করা হবে। আবছা আবছা মনে পড়লো আমাদের ওখানকার শৈব উপাসকদের আচার বিধি।
আমি
স্টুডিয়োর কাজ থামিয়ে দু’একদিনের মধ্যে সুন্দরবনে নিজেদের গ্রামে পৌঁছালাম। বাবা কে বললাম
বিষয়টা। এই অঞ্চলের শৈব উপাশকরা
দীর্ঘদিন ধরে যে ডিকশনে মন্ত্র উচ্চারণ করে করে আসছে, সেটা আমার চাই। বাবা সেভাবে কিছু বলতে পারলেন না। আমি খুঁজে খুঁজে
সেই সমস্ত লোকের বাড়িতে গিয়ে পৌছালাম। কিন্তু সেভাবে পরিস্কার করে কেউ কিছু তুলে
দিতে পারলো না। কেননা সেগুলো ভাঙতে ভাঙতে প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে। অবশেষে একটি ছেলে
তাদের বাড়ির পুরানো খাতা বার করে আমায় কিছুটা দিতে পারলেন। আমি সেখানে শুনে শুনে
ওদের বলার ঢং টা রপ্ত করার চেষ্টা করলাম। কিছুটা ছেলেবেলার স্মৃতিতে ছিলো।
অবশেষে কলকাতা
ফিরে একটি ছেলেকে দিয়ে চেষ্টা করলাম ওই ডায়লেক্টটা তোলাতে। কিন্তু ও শেষ পর্যন্ত
পারলো না। শেষে নিজেই রেকর্ডিং এ ভয়েস দিলাম। অনেক চেষ্টায় আমি আর সুজয়দা লেয়ারের
পর লেয়ার বিছিয়ে আমার ছোটবেলা দেখা চৈত্রের সেই ‘গ্রাম’ শব্দ দিয়ে তুলে
ধরতে সক্ষম হলাম। একটু একটু করে ছবির জট খুলতে থাকলো। স্টুডিয়োতে বসে যখন চোখ বন্ধ করে সেইসব
শুনছি, আমি দেখতে পাচ্ছিলাম সেইসব ফেলে আসা চরিত্রদের। গল্পের পরতে পরতে সাউন্ড
ডিজাইনে আরো সমস্ত চরিত্র ঢুকতে শুরু করলো। আমরা তখনো বুঝতে পারছিনা আসলে গল্পটা
কোনদিকে এগোচ্ছে। অবশেষে অনেক দিনের চেষ্টায় মনে হল- হয়ে উঠছে ছবিটা।
এভাবেই আমাদের
পরিচিতদের দিয়েই ছবিটা দেখাতে শুরু করলাম। এভাবেই ষাট সত্তর জন ছবিটাদেখে ফেললো। ছবিটা
দেখে কেউ চুপ করে রইলেন। কেউ দায়সারা ভাবে কিছু একটা বললেন। আবার কেউকেউ এতটা
উচ্ছসিত, যে বিশ্বাসই হল না।
এইসব মিশ্র
প্রতিক্রিয়া সংগ্রহ করে একটা সময় পর নিজের কাছে ফিরলাম। নিজের সামনে দাঁড়িয়ে লক্ষ
করলাম ছবিটার মত আমিও হয়তো হয়ে উঠছি। আমার মত ছবিটার মধ্যেও অনেক ভুল, সে ভুল গুলো
আর কখনো সংশোধন হবে না। তবে তা নিয়ে কোনো আফসোস নেই। বাবার কথা খুব মনে পড়ছে, বাবা
রেজাল্ট খারাপ হলে বকাঝকা করার পরেও বলতেন- ‘ওসব নিয়ে ভেবোনা, সামনের দিকে তাকাও’।
বাবা ছবিটা দেখে কিছু বলেননি। কিন্তু বেশ
বুঝতে পারি উনি অন্তত বিরক্ত হননি। আমি এই ছবি নির্মাণের পরীক্ষাতে পাশ করেছি কিনা
জানিনা। তবে নিজের কাছে জিতে গেছি।








0 comments:
Post a Comment